সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের মুক্তির দাবিতে রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) রাজধানী অভিমূখে পদযাত্রা রুখতে পাকিস্তানের সরকার ইসলামাবাদে হাজার হাজার পুলিশ মোতায়েন করেছে। মহাসড়কগুলোতে ব্যারিকেড বসানোসহ ব্যাপক ধরপাকড় চালানো হচ্ছে।

খান-এর দল 'পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ' (পিটিআই)-এর এই পদযাত্রা ঠেকাতে সরকার কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে। দুর্নীতির অভিযোগে ২০২৩ সাল থেকে কারাগারে থাকা খানের প্রতি আচরণ নিয়ে ক্রমবর্ধমান উদ্বেগের মধ্যেই এই কর্মসূচির ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল।

শুক্রবার (২৫ সেপ্টেম্বর) পিটিআই নেতারা জানান, তারা পদযাত্রা শুরুর সময় ২৭ সেপ্টেম্বরের নির্ধারিত তারিখ থেকে পিছিয়ে ৪ অক্টোবর করবেন। তাদের আশা, এই বিলম্ব সরকারের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করবে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই বিক্ষোভ সামরিক-সমর্থিত সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে; কারণ এই সরকারকে ব্যাপকভাবে দুর্বল, অবৈধ ও অজনপ্রিয় হিসেবে দেখা হয়, অন্যদিকে খান এখনো ব্যাপক জনপ্রিয় এবং জনসমর্থন আদায়ের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন। ক্ষমতাসীন জোটের নেতৃত্বে রয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ, তবে সেনাবাহিনীর প্রধান ফিল্ড মার্শাল অসীম মুনিরকেই দেশের প্রকৃত বা 'ডি ফ্যাক্টো' নেতা হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

এই সপ্তাহে পিটিআই-এর বহু নেতা ও মন্ত্রীকে আটক করা হয়েছে বা তাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে। এছাড়া সোমবার খানের তিন বোনকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং নিরাপত্তার জন্য গুরুতর হুমকি সৃষ্টির অভিযোগে তারা এখনো কারাগারে রয়েছেন।

যাদের গ্রেপ্তারের আশঙ্কা রয়েছে তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন সোহেল আফ্রিদি—যিনি খানের নিজ প্রদেশ এবং পিটিআই-এর শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত খাইবার পাখতুনখোয়ার মুখ্যমন্ত্রী। এই প্রদেশ থেকেই হাজার হাজার সমর্থকের রাজধানীতে পদযাত্রায় যোগ দেওয়ার কথা রয়েছে।

আফ্রিদি বলেছেন, খানের মামলাগুলোর সুষ্ঠু শুনানি এবং কারাগারে তাঁর প্রতি আচরণ ও সুযোগ-সুবিধার বিষয়ে সরকার উল্লেখযোগ্য ছাড় না দিলে পিটিআই এই পদযাত্রা চালিয়ে যাবে।

তিনি বলেন, "সরকার আতঙ্কিত—এ কারণেই তারা ইসলামাবাদকে অবরুদ্ধ করে রেখেছে এবং আমাদের মন্ত্রীদের তুলে নিয়ে যাচ্ছে।" “তবে ইমরান খান দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় নেতা এবং মানুষ তাঁর জন্য রাস্তায় নেমে আসবে। আমি নিশ্চিত যে, সাধারণ মানুষ যখন রাস্তায় নেমে আসবে এবং ইসলামাবাদের দিকে যাত্রা করবে, তখন তাদের সেই গণশক্তিকে কেউ আটকাতে পারবে না।”

আফ্রিদি স্বীকার করেন যে, ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা মোতায়েনের ফলে অনেকের মধ্যেই আশঙ্কা তৈরি হয়েছে—আগের বিক্ষোভগুলোর মতোই এবারও হয়তো খানের সমর্থকদের রাজধানীতে প্রবেশে বাধা দিতে গিয়ে সহিংস সংঘাতের ঘটনা ঘটতে পারে।

সরকার ইতিমধ্যেই খাইবার পাখতুনখোয়া অঞ্চলে হাজার হাজার নিরাপত্তা কর্মী মোতায়েন করেছে এবং প্রাদেশিক রাজধানী পেশোয়ারের সাথে ইসলামাবাদকে সংযোগকারী প্রধান মহাসড়কটি বন্ধ করে দিয়েছে।

আফ্রিদি বলেন, “আমি জানি, আমাদের আটকাতে তারা বলপ্রয়োগের মাধ্যমে যেকোনো পর্যায়ে যেতে পারে; এ নিয়ে আমাদের কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু যদি আমাদের সাথে বিপুল সংখ্যক মানুষ থাকে, তবে তারা আমাদের ওপর গুলি চালাতে পারবে না। আমাদের পরিকল্পনা হলো এত বেশি সংখ্যক মানুষকে নিয়ে আসা যাতে তারা নতিস্বীকার করতে বাধ্য হয়।”

কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়োগকৃত খাইবার পাখতুনখোয়ার গভর্নর ফয়সাল করিম কুন্দি পিটিআই-এর বিরুদ্ধে নেওয়া নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে ‘সতর্কতামূলক পদক্ষেপ’ হিসেবে অভিহিত করে দলটির বিরুদ্ধে “অস্থিরতা ও সহিংসতা” সৃষ্টির চেষ্টার অভিযোগ আনেন। কুন্দি বলেন, “কোনো সহিংস গোষ্ঠীকে ইসলামাবাদের দিকে মিছিল নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার অনুমতি রাষ্ট্র দিতে পারে না।”

ইসলামাবাদে জনমনে ক্ষোভ বাড়ছে; কারণ খানের দলের সমর্থকদের রাজধানীতে প্রবেশ ঠেকাতে সরকারের নেওয়া নানা পদক্ষেপের ফলে শহরটি এখন অনেকটা কঠোর নিরাপত্তাবেষ্টিত দুর্গের রূপ নিয়েছে।

রাস্তা আটকে দেওয়ার জন্য এক হাজারেরও বেশি শিপিং কন্টেইনার (যার অনেকগুলোতেই ধারালো স্পাইক বা কাঁটা লাগানো) ব্যবহার করা হয়েছে এবং সেতুর ওপর বালির বস্তা বসানো হয়েছে; পাশাপাশি রাজধানীতে প্রবেশের একটি প্রধান মহাসড়কও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ইসলামাবাদে জনসমাবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং পুরো রাজধানীজুড়ে ২২ হাজার পুলিশ ও অন্যান্য নিরাপত্তা কর্মী মোতায়েন করা হয়েছে।

দ্য গার্ডিয়ান