ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত হুথি গোষ্ঠী বুধবার (৭ অক্টোবর) ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও বিস্ফোরক-বোঝাই ড্রোন দিয়ে এডেন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামলা চালিয়েছে। দেশটির পরিবহন মন্ত্রণালয় এ কথা জানিয়েছে।
সাম্প্রতিক
দিনগুলোতে লড়াই মূলত বাব
আল-মান্দেব প্রণালীর আশপাশের এলাকাগুলোতে কেন্দ্রীভূত হয়েছে। হরমুজ প্রণালী দিয়ে বাণিজ্য সীমিত
হয়ে পড়ায় জ্বালানি রপ্তানির
ক্ষেত্রে এই নৌপথ অত্যন্ত
গুরুত্বপূর্ণ।
এই সপ্তাহে, সৌদি-নেতৃত্বাধীন জোটের
বিমান সহায়তায় ইয়েমেনের সরকারি বাহিনী প্রণালীর কাছে এবং মোখা
শহরের আশপাশের কৌশলগত এলাকাগুলো পুনরুদ্ধারের জন্য পাল্টা অভিযান
শুরু করেছে—যে এলাকাগুলো গত
সেপ্টেম্বরে হুথিরা দখল করে নিয়েছিল।
তবে তাদের এই অগ্রযাত্রা কতটা
স্থায়ী হবে, তা এখনো
অস্পষ্ট।
যুক্তরাষ্ট্র
ও ইরানের মধ্যকার বৃহত্তর সংঘাতের জের হিসেবে ছড়িয়ে
পড়া এই লড়াই ইয়েমেনের
দীর্ঘ ১২ বছরের জটিল
যুদ্ধকে নতুন করে উসকে
দিয়েছে। এই যুদ্ধের ফলে
বিশ্বজুড়ে অন্যতম ভয়াবহ মানবিক সংকট তৈরি হয়েছে
এবং আরব বিশ্বের সবচেয়ে
দরিদ্র দেশটি খণ্ড-বিখণ্ড হয়ে
পড়েছে। ইন্টারন্যাশনাল অর্গানাইজেশন ফর মাইগ্রেশন (আইওএম)
বুধবার জানিয়েছে, লড়াইয়ের সর্বশেষ ধাপ শুরুর পর
থেকে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা ২ লাখ ছাড়িয়েছে।
আইওএম-এর মহাপরিচালক অ্যামি
পোপ বলেন, "মানুষ জীবন বাঁচাতে ছুটছে
কিন্তু নিরাপদ কোনো আশ্রয় খুঁজে
পাচ্ছে না।" তিনি খাদ্য ও
আশ্রয়ের ক্রমবর্ধমান চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে আরও তহবিলের আহ্বান
জানান। উভয় পক্ষই দাবি
করেছে যে লড়াইয়ে শত
শত মানুষ নিহত হয়েছে, তবে
এ বিষয়ে বিস্তারিত কোনো তথ্য দেওয়া
হয়নি। জাতিসংঘের তথ্যমতে, ইয়েমেনের বিভিন্ন এলাকায় প্রতি চারটি পরিবারের মধ্যে তিনটিই অনাহারের শিকার হচ্ছে।
হুথিরা
বারবারই যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশ সৌদি আরবের
বিভিন্ন অবকাঠামো—যেমন বিমানবন্দর, তেল
শোধনাগার ও পাইপলাইন—লক্ষ্য
করে হামলা চালিয়ে আসছে।
বুধবার
সৌদি-নেতৃত্বাধীন জোট জানিয়েছে যে
তারা সৌদি রাজধানী রিয়াদের
উত্তরে হুথিদের একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র
প্রতিহত ও ধ্বংস করেছে।
জোটটি আরও জানায়, তারা
হুথি-নিয়ন্ত্রিত সানা এলাকায় ক্ষেপণাস্ত্র
উৎক্ষেপণকারী স্থানটির ওপর নজর রাখছে
এবং সেটি ধ্বংস করবে;
তবে হতাহত বা ক্ষয়ক্ষতির বিষয়ে
কোনো বিস্তারিত তথ্য দেয়নি।
হুথিদের
সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি এক বিবৃতিতে
জানিয়েছেন যে, তাদের গোষ্ঠী
বেশ কয়েকটি ড্রোন দিয়ে রিয়াদের কিং
খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে লক্ষ্যবস্তু করেছে। তবে বিমানবন্দরটিতে হামলার
বিষয়ে সৌদি কর্তৃপক্ষের পক্ষ
থেকে তাৎক্ষণিক কোনো নিশ্চিতকরণ বার্তা
পাওয়া যায়নি।
প্রণালীর
দখল নিয়ে যুদ্ধ
এই প্রণালীর ওপর হুথিদের কোনো
ধরনের নিয়ন্ত্রণ বা আধিপত্য জাহাজ
চলাচল কিংবা বিশ্বজুড়ে তেল সরবরাহের ক্ষেত্রে
হুমকি সৃষ্টি করতে পারে; আর
তাই হুথিদের প্রতিহত করতে সৌদি আরব
আন্তর্জাতিক সহায়তা চাইছে। বুধবার দুজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন
যে তুরস্ক মূলত প্রতিরক্ষামূলক ও
কারিগরি সহায়তা পাঠাচ্ছে। উল্লেখ্য, ন্যাটো সদস্য তুরস্ক এবং পাকিস্তান তাদের
নবগঠিত জোটের আওতায় যৌথ প্রতিরক্ষার প্রতিশ্রুতি
বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করেছে।
ইয়েমেনের
সামরিক ও সরকারি সূত্রগুলোর
তথ্যমতে, পশ্চিমা রণাঙ্গনে লড়াই মূলত বাব
আল-মানদাব প্রণালীর ওপর নজর রাখা
ধুবাব (Dhubab) জেলাতেই সীমাবদ্ধ রয়েছে; সেখানে সরকারি সমর্থিত বাহিনী উপকূলীয় সমভূমির পূর্বদিকের কৌশলগত পাহাড়গুলোর দিকে অগ্রসর হওয়ার
চেষ্টা চালাচ্ছে। এ সময় তীব্র
সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে এবং
হুথিরা দাবি করেছে যে
তারা এসব হামলা প্রতিহত
করতে সক্ষম হয়েছে।
সোমবার
ইয়েমেনি সরকার দাবি করেছিল যে
তারা মোচা (Mocha) শহরে পৌঁছে গেছে—শহরটি গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধক্ষেত্র তাইজ-এর (Taiz) সাথে
সংযোগকারী সরবরাহ পথের একটি সন্ধিস্থলে
অবস্থিত। তবে মাঠপর্যায়ের ইয়েমেনি
সামরিক কর্মকর্তা ও বিশ্লেষকদের মতে,
ওই দাবিটি ছিল অকালপক্ব বা
তাড়াহুড়ো করে করা।
ইয়েমেন-কেন্দ্রিক থিংক-ট্যাঙ্ক 'সানা
সেন্টার'-এর গবেষক হুসাম
রাদমান জানিয়েছেন, সরকারি সমর্থিত বাহিনী—যার মধ্যে রয়েছে
পাল্টা আক্রমণের নেতৃত্বদানকারী সুন্নি সালাফি গোষ্ঠী 'জায়ান্টস ব্রিগেড'—ধুবাবের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার এবং এর পূর্বদিকের
পাহাড়ি এলাকায় অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করছে।
তিনি
বলেন, ওই উচ্চভূমির নিয়ন্ত্রণ
পেলে সরকারি বাহিনীর পক্ষে উপকূলের বাকি অংশে আরও
সহজে অগ্রসর হওয়া সম্ভব হবে।
বিমানবন্দরে
আঘাত
পরিবহন মন্ত্রণালয়
জানিয়েছে, ইয়েমেনের পূর্ব উপকূলীয় এলাকায় অবস্থিত এডেন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে রানওয়ের
কাছে একটি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে। কায়রো থেকে আসা একটি বিমানের অবতরণের ঠিক কয়েক মিনিট
আগে এই ঘটনাটি ঘটে। কর্তৃপক্ষ বিমানটির অবতরণ বাতিল করে সেটিকে জেদ্দায় পাঠিয়ে দেয়
এবং আরও হামলার আশঙ্কায় রানওয়েতে থাকা দুটি বিমানকে নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে নেওয়া হয়।
এ বিষয়ে হুথিদের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
হুথিদের নিয়ন্ত্রণের
বাইরে থাকা ইয়েমেনের বিভিন্ন অঞ্চলের জন্য এডেন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরটি প্রধান আন্তর্জাতিক
প্রবেশপথ হিসেবে কাজ করে।
ইয়েমেনের উত্তরাঞ্চলের
বড় অংশের নিয়ন্ত্রণকারী হুথিরা ২০১৪ সালে রাজধানী সানা দখল করে নেয়। এর ফলে সৌদি আরবের
নেতৃত্বে একটি সামরিক জোট সেখানে হস্তক্ষেপ করতে বাধ্য হয়; কারণ তারা ইয়েমেনে প্রতিদ্বন্দ্বী
ইরানের প্রভাব বিস্তার এবং নিজেদের সীমান্তে অস্থিতিশীলতা নিয়ে শঙ্কিত ছিল। ২০২২ সালে
জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় একটি যুদ্ধবিরতি বড় ধরনের সংঘাত থামিয়ে দিলেও, তা কোনো স্থায়ী
সমাধানের পথ তৈরি করতে পারেনি।
সৌদি-নেতৃত্বাধীন
জোটের অভিযোগ, ইরান হুথিদের অস্ত্র সরবরাহ, প্রশিক্ষণ ও অর্থায়ন করছে। পাহাড়ি এলাকা
থেকে উঠে আসা এই গোষ্ঠীটি বর্তমানে হাজার হাজার যোদ্ধার সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী বাহিনীতে
পরিণত হয়েছে এবং তাদের কাছে থাকা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন পুরো অঞ্চলের জন্য হুমকি হয়ে
দাঁড়িয়েছে। তবে তারা ইরানের মধ্যপ্রাচ্য-কেন্দ্রিক প্রক্সি নেটওয়ার্কের অংশ হওয়ার বিষয়টি
অস্বীকার করে এবং দাবি করে যে তারা নিজেরাই নিজেদের অস্ত্র তৈরি করে। তেহরানও এসব অভিযোগ
প্রত্যাখ্যান করেছে।
এর আগে বুধবার
সৌদি রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন জানায়, সৌদি-নেতৃত্বাধীন জোট দক্ষিণ-পশ্চিমের শহর খামিস মুশাইতের
দিকে ছোড়া হুথিদের একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র মাঝপথেই ধ্বংস করেছে।
আলাদা এক বিবৃতিতে হুথি মুখপাত্র সারি জানান, তারা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহার করে আবহা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং খামিস মুশাইতের একটি বিমানঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছে। তবে সৌদি কর্তৃপক্ষ আবহা বিমানবন্দরে হামলার বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত করেনি।
রয়টার্স