বাংলাদেশের রহস্যময় স্ট্রিট আর্টিস্ট হবেকি?-এর আইকনিক ‘সুবোধ’ গ্রাফিতির প্রথম আন্তর্জাতিক উপস্থিতি সিকিমের রংপোর একটি দেওয়াল থেকে পাঁচ দিনের মাথায় মুছে ফেলা হয়েছে।
গ্যাংটক-রংপো সড়কের মাজিতার
নালা সেতুর কাছে গত ৩০
জুন আঁকা বড় আকারের
স্টেনসিল ম্যুরালটি প্রথম প্রকাশ্যে আসার পরই বাংলাদেশ
ও ভারতে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
এটি
ছিল বাংলাদেশের বাইরে হবেকি?-এর কাজের প্রথম
উপস্থিতি। সীমান্তের দুই পারেই সংবাদপত্র,
টেলিভিশন, অনলাইন সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে
এটি ব্যাপক আলোচিত হয়।
ভারতের
বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম ম্যুরালটিকে ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করে।
কেউ একে সমসাময়িক স্ট্রিট
আর্টের একটি ব্যতিক্রমী নিদর্শন
হিসেবে দেখেছে, আবার কেউ সংবেদনশীল
সীমান্তবর্তী রাজ্যে এমন শিল্পকর্মের উপস্থিতি
নিয়ে প্রশ্ন তুলে সম্ভাব্য নিরাপত্তাজনিত
দিক নিয়েও আলোচনা করেছে। অল্প সময়ের মধ্যেই
এটি জনপরিসরের বিতর্কে পরিণত হয়; শিল্পের গণ্ডি
ছাড়িয়ে সীমান্ত, পরিচয়, কূটনীতি ও জনপরিসর নিয়েও
শুরু হয় আলোচনা।
শিল্পীর
কাজ নিয়ে নথিপত্র সংরক্ষণকারী
আর্ট এজেন্সি আর্টকন (ARTCON) জানিয়েছে, ম্যুরালটি ইতোমধ্যে সরিয়ে ফেলা হয়েছে। তবে
এটি কে বা কারা
অপসারণ করেছে, সে বিষয়ে এখন
পর্যন্ত কোনো ব্যক্তি বা
কর্তৃপক্ষ দায় স্বীকার করেনি।
এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যাও
দেওয়া হয়নি। ফলে গ্রাফিতিটি কীভাবে
বা কেন সরানো হলো,
তা এখনও অজানা।
অবশ্য
এক অর্থে এটি স্ট্রিট আর্টের
স্বাভাবিক পরিণতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণই বলা চলে। খোলা
দেওয়ালে আঁকা গ্রাফিতি নিয়মিতই
আবহাওয়া, উন্নয়নকাজ, পুনরায় রঙ করা, রাজনৈতিক
পোস্টার কিংবা বিজ্ঞাপনের কারণে হারিয়ে যায়। বাংলাদেশেও এমন
বহু গুরুত্বপূর্ণ গ্রাফিতি রয়েছে, যা আঁকার কয়েক
দিন বা কয়েক মাসের
মধ্যেই হারিয়ে গেছে।
তবে
দক্ষিণ এশিয়ার স্ট্রিট আর্টে হবেকি?-এর কাজের অবস্থান
আলাদা। শিল্পীর পরিচয় গোপন রাখা, সহজে
চেনা যায় এমন স্বতন্ত্র
চিত্রায়ণ এবং নিজের কোনো
শিল্পকর্মের ব্যাখ্যা না দেওয়ার মতো
প্রতিটি অবস্থান ‘সুবোধ’-এর নতুন নতুন
ম্যুরালকে আলাদা গুরুত্ব দিয়েছে। প্রতিবারই তাদের নতুন শিল্পকর্ম জনমনে
কৌতূহল সৃষ্টি করেছে, নানা ধরনের ব্যাখ্যা
জন্ম দিয়েছে এবং কখনও কখনও
বিতর্কেরও কারণ হয়েছে। একই
কারণে বাংলাদেশেও শিল্পীর বেশ কয়েকটি আলোচিত
ম্যুরাল জনগণের দৃষ্টি আকর্ষণের অল্প সময়ের মধ্যেই
হারিয়ে গেছে।
এ বিষয়ে সমাজচিন্তক অধ্যাপক মানস চৌধুরী বলেন,
রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল শিল্প প্রায়ই সমাজের একটি অংশের মধ্যে
অস্বস্তির জন্ম দেয়। শক্তিশালী
প্রতীকী অর্থবহ গ্রাফিতি বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে বারবার হারিয়ে যাওয়ার নজির রয়েছে।
সিকিমের
ম্যুরালটি দ্রুত মুছে ফেলার বিষয়ে
প্রতিক্রিয়া জানিয়ে তিনি বলেন, এটি
একটি জটিল অনুভূতির জন্ম
দেয়। কারণ, অবস্থানগত কারণে অধিকাংশ মানুষের এই চিত্রকর্মটি সরাসরি
দেখারই সুযোগ হওয়ার কথা ছিল না,
অথচ এটি এত দ্রুত
মুছে ফেলা হলো।
তিনি
আরও বলেন, ‘হবে কি’ বা
‘সুবোধ’ সিরিজের একাধিক কাজ ঢাকার বিভিন্ন
দেওয়ালে এখনও টিকে আছে,
আবার কিছু কাজ বেশিদিন
স্থায়ী হয়নি। তবে সিকিমের এই
ম্যুরালটির কৌশলগত অবস্থান এবং অল্প সময়েই
যে গুরুত্ব অর্জন করেছিল, তাতে এটি হারিয়ে
যাওয়ার অনুভূতি আরও গভীর এবং
এক ধরনের অদ্ভুত শূন্যতার সৃষ্টি করেছে।
কোনো
সরাসরি ব্যাখ্যা না দিয়েই সিকিমের
এই ম্যুরালটি দর্শকের ব্যাখ্যার জন্য উন্মুক্ত ছিল।
এতে দেখা যায়, ‘সুবোধ’
কাঁটাতারের বোনা একটি দোলনায়
শুয়ে আছে। তার হাতে
একটি তার কাটার যন্ত্র,
নিচে রাখা একটি বালতি
এবং পাশ দিয়ে বয়ে
যাচ্ছে তিস্তা নদী। হবেকি?-এর
অন্যান্য কাজের মতোই এ শিল্পকর্মের
অর্থ বা উদ্দেশ্য সম্পর্কে
শিল্পী কোনো মন্তব্য করেননি।
শিল্প
বিশ্লেষক এবং আর্টকন-এর
প্রতিষ্ঠাতা এআরকে রিপন বলেন, দেওয়াল
থেকে চিত্রটি মুছে গেলেও এটি
যে আলোচনার জন্ম দিয়েছিল, তা
এখনও চলমান। তার ভাষ্য, অনেক
গুরুত্বপূর্ণ স্ট্রিট আর্টের মতোই এই ম্যুরালের
দৃশ্যমান অস্তিত্ব হয়তো স্বল্পস্থায়ী ছিল,
কিন্তু এর সাংস্কৃতিক প্রভাব
আরও দীর্ঘস্থায়ী হবে বলে আমার
বিশ্বাস।
ইউএনবি