মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের টানা দ্বিতীয় রাতের মতো আরও বড় আকারের ইরানের ওপর বিমান হামলা করায় দুই দেশের মধ্যে ভঙ্গুর শান্তি আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে বলে মনে হচ্ছে।

বুধবার (৮ জুলাই) ইরানের দক্ষিণাঞ্চলের কয়েকটি শহরে হামলা চালানোর মাত্র কয়েক ঘণ্টা পর, বৃহস্পতিবার ভোরে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের রাজধানী তেহরানের বিভিন্ন অংশে হামলা চালায়। দুই দিনের এই হামলায় অন্তত ১৪ জন নিহত হয়েছেন, যার মধ্যে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)-এর অন্তত একজন সদস্য রয়েছেন।

ইরান প্রতিবেশী উপসাগরীয় দেশগুলোতে থাকা মার্কিন সামরিক সরঞ্জাম অবকাঠামোর ওপর পাল্টা হামলা চালিয়েছে।

এই সপ্তাহের শুরুতে হরমুজ প্রণালীতে বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর ইরানের হামলার জেরে পাল্টাপাল্টি হামলার এই সর্বশেষ পর্বটি শুরু হয়েছে।

এই মার্কিন হামলা এমন এক সময়ে হয়েছে যখন ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনির কয়েক দিনব্যাপী অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া চলছে। ফেব্রুয়ারিতে যুদ্ধের একেবারে শুরুর দিকে মার্কিন-ইসরায়েল বিমান হামলায় তিনি নিহত হয়েছিলেন। বুধবার তুরস্কের আঙ্কারায় অনুষ্ঠিত ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, তিনি মনে করেন ইরানের সঙ্গে সমঝোতা স্মারকটি (এমওইউ) “শেষ হয়ে গেছে তবে তিনি আরও বলেন যে, তিনি আপাতত শান্তি আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার অনুমতি দিতে পারেন, যা এই প্রক্রিয়াকে অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলে দিয়েছে।

যদিও ট্রাম্প বলেছেন যে এই হামলাগুলোর ফলে কোনোদীর্ঘমেয়াদীসামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হবে না, তবুও আশঙ্কা বাড়ছে যে দুই দেশ হামলা আরও বাড়িয়ে দিতে পারে এবং বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চল আবারও এর মধ্যে জড়িয়ে পড়তে পারে।

ট্রাম্প পরে আরও দাবি করেন যে, “ইরান একটি চুক্তি করতে মরিয়া,” কিন্তু পর্যবেক্ষকরা বিষয়ে সন্দিহান।

ব্র্যাডফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক আলম সালেহ আল জাজিরাকে বলেন, “ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র একটি অচলাবস্থার সম্মুখীন হয়েছে এবং তাদের কৌশল পরিবর্তন করতে হবে। বোমা হামলা কোনো কাজে আসছে না।

যুক্তরাষ্ট্র কেন দ্বিতীয় রাতের মতো হামলা চালিয়েছে?

মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালীতে বাণিজ্যিক জাহাজ এবং নিরীহ বেসামরিক নাবিকদের ওপর হামলা চালানোর ইরানের সক্ষমতা আরও হ্রাস করার লক্ষ্যে বৃহস্পতিবার তারা ইরানজুড়ে প্রায় ৯০টি সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে।

জুনে উভয় পক্ষ সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষর করার পর এটিই ধরনের সবচেয়ে বড় উত্তেজনা বৃদ্ধি।

বুধবার, সেন্টকম জানিয়েছিল যে হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী তিনটি বাণিজ্যিক জাহাজে ইরানের হামলার জবাবে আগের রাতে তারা প্রায় ৮০টি ইরানি সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে।

ওয়াশিংটন সমঝোতা স্মারকের অংশ হিসেবে থাকা ইরানি তেলের ওপর নিষেধাজ্ঞার ছাড়ও প্রত্যাহার করে নিয়েছে।

মার্কিন ইরানি গণমাধ্যম মঙ্গলবার জানিয়েছিল যে প্রণালীটিতে তিনটি জাহাজমার্শাল দ্বীপপুঞ্জের পতাকাবাহী কাতারের মালিকানাধীন এম/টি আল রেকায়াত; সৌদি আরবের পতাকাবাহী এম/টি ওয়েদিয়ান; এবং লাইবেরিয়ার পতাকাবাহী এম/টি সাইপ্রাস প্রসপারিটিআক্রান্ত হয়েছে।

তেহরান-ভিত্তিক বিশ্লেষক হোসেইন রয়ভারান আল জাজিরাকে বলেছেন যে, ট্যাঙ্কারগুলো সম্ভবত এমন একটি এলাকায় ঢুকে পড়ার কারণে আক্রান্ত হয়েছে, যেখানে ইরানি দলগুলো মাইন অপসারণ অভিযান চালাচ্ছিল।

হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে।

এক বিবৃতিতে আইআরজিসি বলেছে, যুদ্ধ-পূর্ববর্তী সময়ের তুলনায় জাহাজ চলাচল ৫০ শতাংশে ফিরে এসেছে এবং বর্তমান এই বিশৃঙ্খলার জন্য পথ নির্ধারণে ওয়াশিংটনেরদুঃসাহসিকতা হস্তক্ষেপ”-কে দায়ী করেছে।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, “এই ভূমিতে এবং হরমুজ প্রণালীতে বিদেশিদের কোনো অধিকার নেই।

এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথে চলাচল এখন মূলত ইরানের অনুমোদিত একটি উত্তরের পথেই সীমাবদ্ধ, অন্যদিকে ওমান যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থিত আরও দক্ষিণের করিডোরে তেমন কোনো কার্যকলাপ দেখা যাচ্ছে না।

আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থার প্রধান জানিয়েছেন যে, প্রায় ,০০০ নাবিক হরমুজ প্রণালীর আশেপাশে আটকা পড়ে আছেন।

এই বেপরোয়া হামলাগুলো আবারও নিরীহ নাবিকদের গুরুতর বিপদের মুখে ফেলেছে। শুধুমাত্র নিজের কাজ করার জন্য কোনো নাবিকেরই জীবন বিপন্ন হওয়া উচিত নয়,” এনবিসি নিউজের বরাত দিয়ে আর্সেনিও ডোমিঙ্গেজ একথা বলেন।

এই পরিসংখ্যানের আড়ালে রয়েছেন নাবিকেরা এবং কিছু ক্ষেত্রে তাদের পরিবার, যারা এই সংঘাতের মানবিক মূল্য ক্রমাগত বহন করে চলেছেন।

আল-জাজিরা