যুক্তরাষ্ট্র শনিবার (৪ জুলাই) ২৫০ বছরে পদার্পণ করেছে। তবে স্বাধীনতার এই ঐতিহাসিক বার্ষিকী উদ্যাপিত হচ্ছে গভীর রাজনৈতিক বিভাজনের প্রেক্ষাপটে। একই সঙ্গে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এ উদ্যাপনের কেন্দ্রবিন্দুতে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
স্বাধীনতা
দিবসের এ আয়োজন এমন
সময় অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যখন তীব্র তাপপ্রবাহে
প্রায় ১৬ কোটি মার্কিন
নাগরিক উচ্চ বা চরম
তাপমাত্রার সতর্কতার আওতায় রয়েছেন। ফলে দেশের বিভিন্ন
শহর ও জনপদে নির্ধারিত
শোভাযাত্রা, ব্লক পার্টি ও
অন্যান্য উৎসবসূচি ব্যাহত হয়েছে।
তবে
প্রচণ্ড গরম প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে
নিরুৎসাহিত করতে পারেনি। তিনি
ব্যাপক উদ্যোগ নিয়েছেন, যাতে এ আয়োজনের
বড় একটি অংশ তাঁর
নেতৃত্ব ও কর্মকাণ্ডকে ঘিরেই
আবর্তিত হয়।
ট্রাম্প
শনিবার সন্ধ্যায় রাজধানী ওয়াশিংটনের ন্যাশনাল মলে নির্বাচনী সমাবেশের
আদলে একটি বিশাল জনসভার
আয়োজন করবেন। এতে সামরিক যুদ্ধবিমানের
মহড়া এবং তার ভাষায়
‘বিশ্বের সবচেয়ে বড়’ আতশবাজি প্রদর্শনীও
থাকবে।
এর আগে তিনি বলেছিলেন,
‘তাপমাত্রা প্রায় ১০৭ ডিগ্রি ফারেনহাইট
(৪১ ডিগ্রি সেলসিয়াস) হবে। তারপরও আমি
সেখানে যাব এবং দীর্ঘ
বক্তৃতা দেব—শুধু এটা
দেখানোর জন্য যে আমি
সবকিছুই করতে পারি।’
শুক্রবার
রাতে ট্রাম্প মাউন্ট রাশমোর জাতীয় স্মৃতিসৌধে ভাষণ দেন। সেখানে
যুক্তরাষ্ট্রের চার কিংবদন্তি সাবেক
প্রেসিডেন্টের বিশাল গ্রানাইট ভাস্কর্যের নিচে দাঁড়িয়ে তিনি
বক্তব্য রাখেন।
‘আমাদের
ভূমিতে কমিউনিস্ট হুমকি’
ট্রাম্প
তার ভাষণে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যতিক্রমী বৈশিষ্ট্যের প্রশংসা করেন এবং দেশটির
অতীত নেতাদের ভূয়সী প্রশংসা করেন। তবে একই সঙ্গে
তিনি দাবি করেন, ‘আমেরিকান
পরিচয় আবারও আক্রমণের মুখে পড়েছে।’
দেশের
অভ্যন্তরের ‘উগ্রপন্থি’ ও ‘চরমপন্থিদের’ লক্ষ্য
করে তিনি অভিযোগ করেন,
‘আমাদের ভূমিতে আবারও কমিউনিস্ট হুমকির পুনরুত্থান ঘটছে।’
সাম্প্রতিক
সপ্তাহগুলোতে তিনি বারবার এ
ধরনের বক্তব্য দিয়েছেন। বিশেষ করে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির
প্রতিষ্ঠিত নেতৃত্ববিরোধী বামপন্থি প্রার্থীরা কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাইমারি নির্বাচনে জয় পাওয়ার পর
ট্রাম্প এ ইস্যুকে আরও
জোরালোভাবে তুলে ধরছেন।
নভেম্বরে
অনুষ্ঠেয় মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে তিনি বামপন্থিদের
‘কমিউনিস্ট’ আখ্যা দিয়ে তাদের দেশটির
জন্য বড় ধরনের ‘হুমকি’
হিসেবে চিত্রিত করছেন।
শুক্রবার
ট্রাম্প বলেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ‘আমাদের ভেতর থেকে আমেরিকান
চেতনাকে ভেঙে ফেলার এবং
আমাদের ইতিহাস থেকে বিচ্ছিন্ন করার
চেষ্টা হয়েছে।’
অভিবাসনবিরোধী
বিষয়ে অতীতের তুলনায় তাঁর ভাষা কিছুটা
সংযত থাকলেও মূল বার্তা একই
ছিল।
তিনি
বলেন, ‘এখানে জন্ম নেওয়া বাধ্যতামূলক
নয়, কিন্তু আমরা যা গড়ে
তুলেছি, তা ভালোবাসতেই হবে।’
উদ্যাপনের
পাশাপাশি আত্মসমালোচনাও
ট্রাম্পের
ভাষণের স্থানটিও ছিল তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ,
তিনি নিজেকেও যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম মহান প্রেসিডেন্ট হিসেবে
দেখতে পছন্দ করেন।
এমনকি
তাঁর সমর্থকেরা জর্জ ওয়াশিংটন, টমাস
জেফারসন, আব্রাহাম লিংকন ও থিওডোর রুজভেল্টের
ভাস্কর্যের পাশে ট্রাম্পের মুখও
খোদাই করার জন্য কংগ্রেসে
একটি বিল উত্থাপন করেছেন।
অন্যদিকে,
যুক্তরাষ্ট্রের ২৫০ বছর পূর্তির
এ আয়োজন অনেক আমেরিকানের কাছে
শুধু উৎসব নয়, আত্মসমালোচনারও
উপলক্ষ্য।
আড়াই
শতাব্দীর ইতিহাসে বিজয়-পরাজয়, দাসপ্রথা
ও স্বাধীনতা, গৃহযুদ্ধ এবং বিশ্বযুদ্ধের অভিজ্ঞতার
পর বিভিন্ন জরিপে দেখা যাচ্ছে, দেশটির
ভবিষ্যৎ নিয়ে মার্কিন সমাজ
গভীরভাবে বিভক্ত।
কুইনিপিয়াক
বিশ্ববিদ্যালয়ের এক জরিপে দেখা
গেছে, ৬১ শতাংশ মার্কিন
নাগরিক মনে করেন, দেশটি
স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে বর্ণিত আদর্শ পূরণ করতে পারেনি।
তবে এ প্রশ্নেও দলীয়
বিভাজন স্পষ্ট। অধিকাংশ রিপাবলিকান মনে করেন দেশটি
আদর্শ অনুসরণ করছে, আর অধিকাংশ ডেমোক্র্যাট
তা মনে করেন না।
লস অ্যাঞ্জেলেসভিত্তিক শিল্পী জনি প্রেসলি বলেন,
‘মানুষ একে অপরকে খুব
বেশি ঘৃণা করে, একে
অপরের কাছ থেকে চুরি
করে। তারা একে অপরকে
ভালোবাসে না।’
তিনি
বলেন, ‘এই দেশ মানুষকে
যেভাবে আচরণ করে, তাতে
আমি ক্লান্ত। বিদেশি প্রতিবেশীদের সঙ্গেও যেভাবে আচরণ করা হয়,
তাতেও আমি বিরক্ত। অনেক
কিছুতেই আমি অতিষ্ঠ।’
তবে
আটলান্টাভিত্তিক শিক্ষাবিদ, মার্কিন-ইরানি বংশোদ্ভূত কারিসা তাভাসোলির মতে, ‘আমেরিকান স্বপ্নে’র মৌলিক ভিত্তি
এখনো অটুট।
তিনি
বলেন, ‘আমি নিরাপত্তা পাই,
বাক্স্বাধীনতা পাই, ধর্মীয় স্বাধীনতা
পাই। একজন নারী হিসেবে
আমি যা খুশি পরতে
পারি।’
তিনি
আরও বলেন, ‘এখানে অনেক ত্রুটি রয়েছে।
কিন্তু আমাদের এমন একটি বিশেষ
ব্যবস্থা আছে, যা রক্ষা
করার মতো মূল্যবান।’
শোশোনি-ব্যানক আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সদস্য আলোনজো কোবি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের
২৫০ বছর পূর্তি উদ্যাপনে
অংশ নিতে পেরে তিনি
কৃতজ্ঞ।
তবে
তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, ‘মানুষ যেন মনে রাখে,
নেটিভ আমেরিকানরা এই ভূখণ্ডে ২৫০
বছরেরও অনেক আগে থেকে
বসবাস করে আসছে।’
এএফপি