প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন যুক্তরাষ্ট্র বেশ জোর দিয়েই বলছে, দীর্ঘস্থায়ী লড়াই চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা তাদের সামরিক বাহিনীর রয়েছে। তবে ইসরায়েলের জন্য চিত্রটা ভিন্ন। গাজায় চলমান জাতিগত নিধন, লেবানন ও সিরিয়ায় যুদ্ধ বা আক্রমণ এবং ইরানের সঙ্গে আগে এক দফা সংঘাত—সব মিলিয়ে ইসরায়েলি বাহিনী ইতিমধ্যেই ক্লান্ত। ফলে একটি দীর্ঘ যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া তাদের জন্য অনেক বেশি ব্যয়বহুল হতে পারে।
গত শনিবার ইরানে হামলা চালানোর পর থেকে ইসরায়েলকে বারবার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার মুখে পড়তে হয়েছে। ফলে দেশজুড়ে বিমান হামলার সতর্কবার্তা জারি, স্কুল বন্ধ এবং হাজার হাজার রিজার্ভ সেনাকে তলব করতে হয়েছে।
হাইফা ও তেল আবিবের মতো শহরগুলো টানা হামলার মুখে পড়েছে। জরুরি পরিষেবা হিমশিম খাচ্ছে। যে মাত্রার যুদ্ধ ইসরায়েলি সরকার অন্যদের ওপর চাপিয়ে দেয়, সেই মাত্রার যুদ্ধের সঙ্গে সে দেশের সাধারণ জনগণ অভ্যস্ত নয়। তাদের বোমা থেকে বাঁচতে বাংকার বা শেল্টারে আসা–যাওয়ার মধ্যেই সময় কাটছে।
আপাতত যুদ্ধ নিয়ে ইসরায়েলি জনগণের উৎসাহ বেশি দেখা যাচ্ছে। বড় বড় শহরে ইসরায়েলিদের সঙ্গে কথা বললে দেখা যায়, তারা এমন এক শত্রুর মোকাবিলা করতে মরিয়া, যাদের সম্পর্কে তাদের কয়েক দশক ধরে বলা হয়েছে, তারা ইসরায়েলকে ধ্বংস করতে বদ্ধপরিকর। কট্টর বামপন্থীরা ছাড়া সব রাজনৈতিক দলই সরকারের পতাকাতলে ঐক্যবদ্ধ হয়েছে।
ইসরায়েলি অর্থনীতিবিদ শির হেভার বলেন, যুদ্ধ শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ইসরায়েলে সামরিক উন্মাদনার জোয়ার বয়ে গেছে।
ইসরায়েলের রাজনীতি নিয়ে খবর রাখা শির হেভার আরও বলেন, এবারের যুদ্ধ ২০২৫ সালের জুনের ১২ দিনের সংঘাতের মতো নয়। তখন মূলত ইসরায়েলিদের মনে আতঙ্ক ও অস্তিত্ব রক্ষার ভয় ছিল। তাঁদের ভয় ছিল, ইরান হয়তো ইসরায়েলকে ধ্বংস করে দেবে। এখন এই যুদ্ধ একরোখা সামরিক উন্মাদনা ও অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস।
শির হেভার বলেন, এমনকি যুদ্ধের গুটিকয় সমালোচকও প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুকে যুদ্ধটি ‘সংক্ষিপ্ত’ রাখার পরামর্শ দিচ্ছেন। বিষয়টি যেন এমন, ইসরায়েল চাইলেই যুদ্ধ কবে শেষ হবে, সেটা ঠিক করতে পারবে।’
যুদ্ধের প্রতি এই সমর্থনকে অনেকেই ইসরায়েলি সমাজের চরমপন্থার দিকে ঝুঁকে পড়ার অংশ হিসেবে দেখছেন। আগে যাঁরা প্রান্তিক পর্যায়ের উগ্র ডানপন্থী রাজনীতিবিদ ছিলেন, তাঁরা এখন সরকারের কেন্দ্রে চলে এসেছেন। রাজনৈতিক মেরুকরণ এবং অর্থনৈতিক চাপে তরুণ ও মেধাবীরা দ্রুত দেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছেন।
ইসরায়েলিদের যাঁরা দেশে রয়েছেন, তাঁরা আগে থেকেই ইরানকে তাঁদের দেশের প্রধান শত্রু হিসেবে ভাবতে অভ্যস্ত। দিনের পর দিন যুদ্ধ চললেও এই সমাজ আরও বেশি সামরিকীকরণ বা যুদ্ধমুখী হয়ে উঠতে পারে।
তেল আবিব বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড্যানিয়েল বার-তাল বলেন, এটি অনেকটা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যুক্তরাজ্যের ওপর নাৎসি জার্মানির বিমান হামলার মতো। তখন ব্রিটিশরা সেই বোমাবর্ষণ মেনে নিয়েছিল। কারণ, তারা চরম অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে লড়ছে বলে মনে করত।
বার–তাল বলেন, ‘ইসরায়েলিদের অনুভূতিও এখন একই রকম। আমাদের প্রায় জন্ম থেকেই শেখানো হয়, ইরান অশুভ। কিন্ডারগার্টেন, হাইস্কুল ও সেনাবাহিনী—সব জায়গাতেই এ ধারণা গেঁথে দেওয়া হয়।’
বার-তালের মতে, কয়েক সপ্তাহের যুদ্ধ শেষে ইসরায়েলি সমাজ কোন দিকে মোড় নেবে, তা আন্দাজ করা কঠিন। তবে তিনি উল্লেখ করেন, ১৯৪৮ সালের ‘নাকবা’ (বিপর্যয়) বা সাম্প্রতিক গাজায় জাতিগত নিধনের সময়ও দেশটির শাসকগোষ্ঠীর নৃশংসতা মানুষের মনে আঁচড় ফেলতে পারেনি।
বার–তাল বলেন, ‘আমাদের কাছে এখন এমন এক প্রজন্ম আছে, যারা আগের চেয়ে বেশি যুদ্ধবাজ ও ডানপন্থী। নেতানিয়াহু আমাদের বলছেন, আমাদের এখন তলোয়ারের ওপর ভর করেই বাঁচতে হবে। এটি প্রমাণ করে, টিকে থাকার জন্য ইসরায়েলের শত্রুর প্রয়োজন।’
বোমা ও বন্দুক
যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে সামাজিক প্রভাবের বাইরেও ইসরায়েলকে সামরিক হিসাব-নিকাশ মাথায় রাখতে হবে।
সবচেয়ে জরুরি বিষয় হচ্ছে, ইরানের মতো বিশাল আয়তন ও সামরিক শক্তিধর প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে ইসরায়েল বর্তমান মাত্রার যুদ্ধ কত দিন চালিয়ে নিতে পারবে, তা ঠিক করে নিতে হবে।
প্রতিরক্ষাবিশ্লেষক হামজে আত্তার বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের মতো মিত্রদের সমর্থনের ওপর বিষয়টি নির্ভর করবে। ইরানের ভান্ডার ফুরানোর আগেই ইসরায়েলের প্রতিরক্ষাব্যবস্থা নিঃশেষ হয়ে যায় কি না, তার ওপর।
হামজে আত্তার আল–জাজিরাকে বলেন, ‘যুদ্ধের প্রথম তিন দিনে ইরান ইসরায়েলের দিকে ২০০-এর বেশি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে। পরিপ্রেক্ষিত বোঝার জন্য বলা যায়, এর আগে ১২ দিনের সংঘাতে ইরান প্রায় ৫০০ ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছিল। প্রতিবারই একটি ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকাতে ইসরায়েলকে একটি ইন্টারসেপ্টর রকেট ছুড়তে হয়েছে। এটি সম্ভবত ইসরায়েলের একার পক্ষে সম্ভব নয়। যুক্তরাষ্ট্রের সাহায্য ছাড়া তারা হয়তো এত দিনে তাদের আকাশসীমার নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলত।’
ইসরায়েলের আলাদা তিনটি আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা রয়েছে—স্বল্পপাল্লার রকেট ঠেকাতে ‘আয়রন ডোম’, মাঝারি পাল্লার রকেট ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকাতে ‘ডেভিডস স্লিং’ এবং ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকাতে ‘অ্যারো-২’ ও ‘অ্যারো-৩’।
ইসরায়েলের ভান্ডারে কত ইন্টারসেপ্টর রকেট আছে, সেটা তারা গোপন রাখে। তবে ১২ দিনের সংঘাতের সময় তাদের মজুত কমে আসছিল। এতে বোঝা যায়, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে উচ্চ মাত্রার প্রতিরক্ষা বজায় রাখা কঠিন হবে। সে ক্ষেত্রে ইন্টারসেপ্টর ব্যবহারে তাদের কৃচ্ছ্রসাধন করতে হতে পারে। তখন শুধু সামরিক ও রাজনৈতিক গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা রক্ষার দিকে নজর দিতে হতে পারে। এতে সাধারণ নাগরিকদের ক্ষয়ক্ষতির ঝুঁকি বৃদ্ধি পেতে পারে।
আত্তার বলছেন, ইসরায়েলি ও মার্কিন সূত্রমতে, জুনে সংঘাতের পর থেকে ইরান প্রতি মাসে ১০০টি করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করছে। এর অর্থ, তেহরান ইতিমধ্যে ক্ষেপণাস্ত্রের বড় মজুত গড়ে তুলেছে।
তবে আত্তার মনে করিয়ে দেন, ইরানের হুমকি শুধু ক্ষেপণাস্ত্রের সংখ্যার ওপর নয়; বরং তাদের কাছে থাকা ক্ষেপণাস্ত্রের ধরনের ওপরও নির্ভর করছে।
আত্তার ক্ষেপণাস্ত্রের ধরন ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন, ইরানের দীর্ঘপাল্লার (যা গ্রিস ও ভূমধ্যসাগর পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে), মাঝারি পাল্লার (যার নিশানা ইসরায়েল পর্যন্ত) এবং স্বল্পপাল্লার (যার নিশানা হতে পারে উপসাগরীয় দেশ) রয়েছে।
হামজে আত্তার আরও যোগ করেন, ‘আমরা জানি না, ১২ দিনের সংঘাতের আগে ইরানের কাছে কতগুলো ক্ষেপণাস্ত্র ছিল, কতগুলো ধ্বংস হয়েছে বা তাদের কাছে কতগুলো লঞ্চার (ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার যন্ত্র) আছে। যদি ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার যন্ত্র না থাকে, তাহলে ক্ষেপণাস্ত্র যা–ই থাকুক, তা কোনো কাজে আসবে না। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল এখন ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার যন্ত্রকে নিশানা করে হামলা চালাচ্ছে।
অর্থনৈতিক বিবেচনা
বিশ্লেষকেরা সতর্ক করে বলছেন, দুই বছরের বেশি সময় ধরে গাজায় চলা নির্বিচার হামলা ইসরায়েলের অর্থনীতির ওপর ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে। গোলাবারুদের খরচ এবং কয়েক লাখ রিজার্ভ সৈন্যকে দীর্ঘ সময় মোতায়েন রাখা ইসরায়েলি রাজকোষের ওপর বড় বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিকল্পনাকারীরা শুরুতে এমন পরিস্থিতির কথা ভাবেননি।
জানা গেছে, ২০২৪ সালে লেবানন ও গাজায় নির্বিচার হামলায় ইসরায়েলের ব্যয় ৩ হাজার ১০০ কোটি ডলারে পৌঁছেছিল। এই ব্যয় দেশটিকে কয়েক বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ বাজেটঘাটতির মুখে ফেলেছে। ২০২৫ সালের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, এসব অভিযানে ব্যয় ৫ হাজার ৫০০ কোটি ডলারে ঠেকেছে।
অর্থনীতির ওপর এই চাপের কারণে ২০২৪ সালে বিশ্বের তিনটি প্রধান ক্রেডিট রেটিং সংস্থা ইসরায়েলের সার্বভৌম ক্রেডিট রেটিং কমিয়ে দিয়েছে।
শির হেভার বলেন, ইসরায়েল এখন ঋণসংকট, জ্বালানিসংকট, পরিবহনসংকট এবং স্বাস্থ্যসেবাসংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
তবে এই অর্থনীতিবিদ সতর্ক করে দিয়ে বলেন, এগুলোর কোনোটিই একা ইসরায়েলের সামরিক অভিযান থামানোর জন্য যথেষ্ট হবে না। কারণ, এটি অর্থনীতির প্রশ্ন নয়, এটি প্রযুক্তির প্রশ্ন।
শির হেভার আরও বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র যদি ইসরায়েলকে এমন উন্নত অস্ত্র সরবরাহ অব্যাহত রাখে, যা নিজেই লোড হতে পারে, নিজেই লক্ষ্য স্থির করতে পারে এবং দূর থেকে হামলা চালাতে পারে, তাহলে আমি মনে করি না, অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সংকট ইসরায়েলের এই আগ্রাসন থামানোর জন্য যথেষ্ট হবে।’
আল–জাজিরা