ভারত সরকার ‘চিকেন নেক’ নামেও পরিচিত শিলিগুড়ি করিডোরে সামরিক অবকাঠামো নির্মাণের কাজ পুরোদমে শুরু করেছে। যদিও বলা হচ্ছে এই চারটি দেশের সীমান্তবর্তী উত্তর-পূর্ব অঞ্চলকে সুরক্ষিত করতে এই তৎপরতা চালানো হচ্ছে।
শিলিগুড়ি করিডোর হলো ২২ কিলোমিটার প্রশস্ত একটি সরু ভূখণ্ড, যা উত্তর-পূর্বের রাজ্য আসাম, অরুণাচল প্রদেশ, মণিপুর, মেঘালয়, নাগাল্যান্ড, মিজোরাম, ত্রিপুরা এবং সিকিমকে ভারতের বাকি অংশের সাথে সংযুক্ত করেছে। এই সংকীর্ণ ভূখণ্ডের উত্তরে নেপাল ও ভুটান, দক্ষিণে বাংলাদেশ এবং এটি চীনেরও খুব কাছাকাছি অবস্থিত।
উত্তর-পূর্ব রাজ্যগুলো এবং ভারতের বাকি অংশের মধ্যে সমস্ত স্থল বাণিজ্য ‘চিকেন নেক’-এর মধ্য দিয়েই সম্পন্ন হয়, এবং এই সংকীর্ণ করিডোরে যেকোনো অবরোধ ভারতের অশান্ত ও অর্থনৈতিকভাবে অনুন্নত উত্তর-পূর্বকে দেশের বাকি অংশ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেবে।
এ কারণে ভারত সরকার স্থলবেষ্টিত এই অঞ্চলের জন্য বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্য দিয়ে একটি বিকল্প পথ তৈরির জন্য বহুদিন ধরে চেষ্টা চালিয়ে আসছে।
ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে ৯০,০০০ বর্গ কিলোমিটার ভূমির মালিকানা দাবি করছে চীন। ১৯৬২ সালে, চীনা সৈন্যরা মাসব্যাপী সংক্ষিপ্ত যুদ্ধে অরুণাচল প্রদেশের বিশাল অংশ দখল করে নেয়। ১৯৮৬ সালে, অরুণাচলের সোমডোরং চু উপত্যকায় দুই দেশের মধ্যে আবারও সংঘর্ষ হয়, যা বেশ কয়েক মাস ধরে চলে।
শিলিগুড়ি করিডোরে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা জোরদার করার বিষয়ে ভারত সরকারের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তটি সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশর সঙ্গে কূটনৈতি সম্পর্কে টানাপড়েন এবং ঢাকা ও বেইজিংয়ের মধে সম্পর্ক জোরদারের প্রেক্ষাপটে নেওয়া হয়েছে বলে মনে হয়। এছাড়া ২০১৭ সালের গ্রীষ্মে ডোকলামে ভারত-চীন সামরিক অচলাবস্থা, যখন ডোকলাম বা ডংল্যাং-এ চীনা সামরিক উপস্থিতি বৃদ্ধির পর ভারতীয় ও চীনা সৈন্যরা প্রায় দুই মাস মুখোমুখি অবস্থানে ছিল। চীন এই অঞ্চলে হেলিপ্যাড ও পরিখা নির্মাণ করে, যা ভারত, ভুটান ও চীনের ত্রি-সংযোগস্থলে অবস্থিত।
এরপর ২০২৪ সালের আগস্টে বাংলাদেশে ভারতপন্থী আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হয় এবং তার জায়গায় মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে একটি অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসন ক্ষমতায় আসে। নতুন সরকারের পররাষ্ট্রনীতিতে ভারতের পরিবর্তে চীন, পাকিস্তানসহ অন্যান্য দেশকে গুরুত্ব দেয়া হয়। বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগ আকর্ষণের উদ্যোগের পাশাপাশি, ইউনূস প্রশাসন ভারতের ‘চিকেন নেক’-এর নিকটবর্তী দেশের লালমনিরহাটে একটি পুরোনো বিমানঘাঁটি সংস্কারের উদ্যোগ নেয়। এটি কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই করিডোরের নিরাপত্তা নিয়ে ভারতের উদ্বেগ বাড়িয়ে তোলে।
এই ঘটনাপ্রবাহ নয়াদিল্লিকে শিলিগুড়ি করিডোর সুরক্ষিত করার জন্য প্রকল্প অনুমোদন করতে প্ররোচিত করে।
সম্প্রতি অনুমোদিত প্রকল্পগুলোর মধ্যে কৌশলগত গুরুত্বের দিক থেকে তালিকার শীর্ষে রয়েছে ভারতের প্রথম নদীর নিচ দিয়ে টুইন-টিউব সড়ক-কাম-রেল টানেল প্রকল্প। আসামের ব্রহ্মপুত্র নদীর নিচে এই টানেল নির্মিত হবে। ৩৩.৭ কিলোমিটার দীর্ঘ, চার-লেনের এই প্রকল্পে ব্রহ্মপুত্রের নিচে ১৫.৭৯ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি টুইন-টিউব টানেল অন্তর্ভুক্ত থাকবে এবং এটি নদীর উত্তর তীরের গোহপুরকে দক্ষিণ তীরের নুমালিগড়ের সাথে সংযুক্ত করবে।
প্রকল্পটি পণ্য পরিবহনের দক্ষতা বৃদ্ধি করবে, লজিস্টিক খরচ কমাবে এবং এই অঞ্চলের আর্থ-সামাজিক প্রবৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করবে বলে আশা করা হচ্ছে। এটি কৌশলগত বিবেচনার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে, প্রধান অর্থনৈতিক কেন্দ্রগুলির মধ্যে সংযোগ শক্তিশালী করবে এবং বাণিজ্য ও শিল্প উন্নয়নের জন্য নতুন পথ খুলে দেবে।
অনুরূপ আরেকটি উদ্যোগ হলো চিকেন’স নেকের মধ্য দিয়ে একটি নতুন ভূগর্ভস্থ রেললাইন নির্মাণের জন্য ভারতীয় রেলের পরিকল্পনা। এ ব্যাপারে রেল, তথ্য ও সম্প্রচার, ইলেকট্রনিক্স ও তথ্য প্রযুক্তি মন্ত্রী অশ্বিনী বৈষ্ণব বলেছেন যে এটি কৌশলগতভাবে সংবেদনশীল, যা এই করিডোরে “নিরাপদ, নির্ভরযোগ্য এবং নিরবচ্ছিন্ন” রেল সংযোগ নিশ্চিত করবে।
৩৫.৭৬ কিলোমিটার দীর্ঘ এই ভূগর্ভস্থ রেললাইন পশ্চিমবঙ্গের দুমডাঙ্গিকে বাগডোগরার সঙ্গে সংযুক্ত করবে। সরকার আশা করছে, এই পথ জরুরি অবস্থার সময় সামরিক কর্মী, রসদ এবং জরুরি ত্রাণ সামগ্রীর নিরবচ্ছিন্ন চলাচল নিশ্চিত করবে। প্রকল্পটি এই অঞ্চলের বাগডোগরা বিমানঘাঁটি এবং বেংডুবি সেনানিবাসের কাছাকাছি অবস্থিত।
ফেব্রুয়ারিতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী পূর্ব আসামের ডিব্রুগড়ে জরুরি অবতরণ কেন্দ্রের উদ্বোধন করেন। জরুরি পরিস্থিতিতে সশস্ত্র বাহিনীর জন্য জরুরি অবতরণ ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহারের উদ্দেশ্যে ৪.২ কিলোমিটার দীর্ঘ মহাসড়কটিকে উন্নত করা হয়েছে।
এই জরুরি অবতরণ কেন্দ্রটি দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে এ ধরনের প্রথম অবকাঠামো। এটি ৪০ টন পর্যন্ত যুদ্ধবিমান এবং ৭৪ টন পর্যন্ত টেক-অফ ওজনের পরিবহন বিমান পরিচালনার জন্য ডিজাইন করা হয়েছে। অপারেশনাল সীমাবদ্ধতা বা জরুরি অবস্থার কারণে ডিব্রুগড় বিমানবন্দর বা চাবুয়া বিমানঘাঁটি ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়লে এটি একটি বিকল্প অবতরণ ক্ষেত্র হিসেবে কাজ করবে।
করিডোরের নিরাপত্তা বাড়ানোর জন্য বাংলাদেশ সীমান্তের কাছে আসামের ধুবরিতে নবপ্রতিষ্ঠিত লাচিত বরফুকন সামরিক ঘাঁটিতে দ্রুত মোতায়েনকারী বাহিনী, গোয়েন্দা ইউনিট এবং বিশেষ বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। বাংলাদেশের অশান্ত চট্টগ্রাম পার্বত্য অঞ্চলের সীমান্তবর্তী মিজোরামে একটি সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে।
প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্রের মতে, অরুণাচল প্রদেশে ভারতীয় সেনাবাহিনী ১৬,০০০ ফুট উচ্চতায় একটি দেশীয় মনোরেল ব্যবস্থা চালু করেছে, যা উচ্চ ভূমিতে রসদ সরবরাহের ক্ষেত্রে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এই ব্যবস্থা, যা একবারে ৩০০ কিলোগ্রামের বেশি ভার বহন করতে পারে, তা অগ্রবর্তী চৌকিগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করবে, যেগুলো প্রায়শই প্রতিকূল ভূখণ্ড এবং অপ্রত্যাশিত আবহাওয়ার কারণে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।
সংকীর্ণ শিলিগুড়ি করিডোর এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলে ভারতের বর্ধিত সামরিক উপস্থিতি এবং পরিকাঠামোর আধুনিকীকরণকে বাহ্যিক হুমকির বিরুদ্ধে একটি কৌশলগত প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখা হচ্ছে। বছরের পর বছর ধরে চীন ও বাংলাদেশ উভয়ের সঙ্গে কিছু অমীমাংসিত বিষয় এবং সাম্প্রতিক ঘটনাবলী, দেশের অন্যতম অনুন্নত অঞ্চল হিসেবে বিবেচিত এই অঞ্চলের জন্য নয়াদিল্লিকে তার প্রতিরক্ষা পরিকল্পনা নতুন করে সাজাতে বাধ্য করেছে বলে মনে হচ্ছে।
রাজীব ভট্টাচার্য, আসামের একজন সিনিয়র সাংবাদিক
দ্য ডিপ্লোম্যাট থেকে অনুবাদ