২০২১ সালের গ্রীষ্মে আফগানিস্তান থেকে মার্কিন ও মিত্র বাহিনীর এলোমেলো এবং তড়িঘড়ি প্রত্যাহারের পর থেকে ওয়াশিংটন তালেবানকে—কিংবা অন্য কোনো গোষ্ঠীকে—আফগানিস্তানের বৈধ সরকার হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি। ওয়াশিংটন দাবি করে যে, তারা এমন একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সরকারের পক্ষে, যা নারী ও সংখ্যালঘুদের অধিকারসহ মানবাধিকারকে সম্মান করে।
২০২১ সালের
৩১শে আগস্ট থেকে আফগানিস্তানে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাস তার কার্যক্রম স্থগিত রেখেছে
এবং কাতারে অবস্থিত আফগানিস্তান অ্যাফেয়ার্স ইউনিট (এএইউ) আফগানিস্তানের জন্য মার্কিন
কূটনৈতিক মিশন হিসেবে কাজ করছে। তা সত্ত্বেও, গত পাঁচ বছরে মার্কিন কর্মকর্তা এবং তালেবানের
মধ্যে সুনির্দিষ্ট যোগাযোগ হয়েছে, যা মূলত সন্ত্রাসবাদ দমন, বন্দি মুক্তি এবং আফগানিস্তান
থেকে মার্কিন নাগরিকদের সরিয়ে আনার সাথে সম্পর্কিত।
যুক্তরাষ্ট্র
দাবি করে যে, তারা শুধুমাত্র নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে তালেবানের সাথে যোগাযোগ রাখে।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের সন্ত্রাসবাদ-বিরোধী সমন্বয়কারী রাষ্ট্রদূত গ্রেগরি ডি.
লোজারফো গত সপ্তাহে বলেছেন যে, “তালেবানের ক্ষেত্রে, আমরা খুব নির্দিষ্ট নিরাপত্তা
সংক্রান্ত বিষয়ে মার্কিন স্বার্থে বেছে বেছে তাদের সাথে যোগাযোগ করি।”
জবাবে, দোহায়
নিযুক্ত তালেবানের রাষ্ট্রদূত সুহাইল শাহিন টোলোনিউজকে বলেছেন যে, “আফগানিস্তান
এখন আর কোনো দেশের জন্য হুমকি নয়,” এবং তালেবান সরকার “অস্থিতিশীলকারী গোষ্ঠীগুলোর
বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য কাজ করেছে।”
শাহিন আরও বলেন,
“যেমনটা সকলের কাছে স্পষ্ট, আমাদের দেশের পুনর্গঠন, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং বিভিন্ন
খাতে সহযোগিতা প্রয়োজন। তাই, এই স্বার্থগুলো বিবেচনায় রেখে এবং আমাদের নীতিমালার
আলোকে, আমরা অন্যান্য দেশের সাথে সম্পর্ক স্থাপন ও বজায় রাখতে চাই। এটাই আমাদের নীতির
মূল কাঠামো।”
এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের
সাথে “সুনির্দিষ্ট” যোগাযোগও তালেবানের জন্য তাৎপর্যপূর্ণ।
ট্রাম্প প্রশাসন আফগানিস্তানের প্রতি মার্কিন বৈদেশিক সহায়তা এবং অভিবাসন নীতি পরিবর্তন
করেছে। বাইডেন প্রশাসনের অধীনে, যুক্তরাষ্ট্র ২০২১ সালের অক্টোবরের পর আফগানিস্তানে
উন্নয়ন ও মানবিক সহায়তার জন্য ৩.৮ বিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থ প্রদান করেছে। তবে, ট্রাম্প
প্রশাসন দেশটিতে চলমান মানবিক সংকট সত্ত্বেও ২০২৫ সালের মাঝামাঝি থেকে আফগানিস্তানে
সমস্ত বৈদেশিক সহায়তা বন্ধ করে দিয়েছে।
পাশাপাশি, প্রেসিডেন্ট
ডোনাল্ড ট্রাম্প সেইসব আফগানদের পুনর্বাসিত করার কর্মসূচি বন্ধ করে দিয়েছেন, যারা
আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের তথাকথিত সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের সময় দেশটির পক্ষে কাজ
করেছিল। ২০২১ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত, ১,৯০,০০০-এর বেশি আফগান
নাগরিককে যুক্তরাষ্ট্রে পুনর্বাসিত করা হয়েছিল। দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পরপরই,
ট্রাম্প এই সুবিধাগুলো বন্ধ করে দেন এবং মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের ‘অফিস অফ দ্য কোঅর্ডিনেটর
ফর আফগান রিলোকেশন এফোর্টস (কেয়ার) বন্ধ করে
দেন। বর্তমান প্রশাসন বিশেষ অভিবাসী ভিসা (এসআইভি) সহ আফগান নাগরিকদের জন্য সমস্ত ভিসার
প্রক্রিয়াকরণও স্থগিত করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের
জন্য আফগানিস্তান এখন অতীতের বিষয়। ওয়াশিংটন প্রায়ই আফগানিস্তান যুদ্ধ নিয়ে আলোচনা
করতে অনীহা দেখায়, যা ১৯৫৫ থেকে ১৯৭৫ সালের মধ্যে ভিয়েতনামে মার্কিন যুদ্ধের পরবর্তী
রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক এড়িয়ে চলারই প্রতিচ্ছবি। ভিয়েতনামের মতোই আফগানিস্তানেও ওয়াশিংটন
তার উদ্দেশ্য পূরণে ব্যর্থ হয়েছে। প্রায় দুই দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্রের লড়াইয়ের পর
তালেবানরা পুনরায় ক্ষমতায় ফিরে আসে। এর পরপরই একটি অপরিকল্পিত মার্কিন প্রত্যাহার
ঘটে, যা প্রকৃতপক্ষে ছিল মুখরক্ষার একটি পদক্ষেপ। আফগানিস্তান থেকে সেনা প্রত্যাহারের
পর দেশটি জনপরিসরে এবং যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির অগ্রাধিকারের তালিকায় তার স্থান
হারিয়েছে। সম্ভবত একারণেই দেশটি ওয়াশিংটনের ২০২৫ সালের জাতীয় নিরাপত্তা কৌশল বা
২০২৬ সালের জাতীয় প্রতিরক্ষা কৌশলে অন্তর্ভুক্ত নয়।
ওয়াশিংটন ও
তালেবানের মধ্যে যোগাযোগের অল্প কয়েকটি ক্ষেত্রের মধ্যে একটি হলো বন্দি বিনিময় নিয়ে
আলোচনা। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে, বাইডেন প্রশাসনের শেষ সময়ে, তালেবান একজন আফগান নাগরিকের
বিনিময়ে জর্জ গেলজম্যান ও মাহমুদ হাবিবি নামের দুই মার্কিন নাগরিককে মুক্তি দেয়।
কাতারের মধ্যস্থতায় দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা বেশ কয়েক দফা আলোচনার ফলস্বরূপ
এই বিনিময়টি সম্পন্ন হয়। এরপর থেকে আফগানিস্তানে আটক আরও বেশ কয়েকজন মার্কিন নাগরিককে
তালেবান সরকার মুক্তি দিয়েছে।
যদিও এই আলোচনাগুলো
শুধুমাত্র মার্কিন নাগরিকদের মুক্তির জন্য, তালেবানের জন্য এটি মার্কিন কর্মকর্তাদের
সাথে মুখোমুখি বসার একটি সুযোগ। যুক্তরাষ্ট্র এটিকে "জিম্মি কূটনীতি"-র এক
জঘন্য চর্চা বলে অভিহিত করে, কিন্তু আফগানিস্তানের কার্যত শাসকদের জন্য এটি দেশের উপর
তাদের শাসন প্রদর্শনের একটি বাস্তবসম্মত পন্থা। যুক্তরাষ্ট্রের মনোযোগের আরেকটি ক্ষেত্র
হলো—অন্তত কথার দিক থেকে—মানবাধিকারের বিষয়টি, বিশেষ করে তালেবান
শাসনাধীন আফগানিস্তানে নারীদের অধিকার।
২০০১ সালের
অক্টোবরে আফগানিস্তানে মার্কিন আগ্রাসনের সময়, ওয়াশিংটন দেশটিতে আগ্রাসনের যুক্তির
অংশ হিসেবে তালেবানের লিঙ্গ-ভিত্তিক দমনপীড়নকে ব্যবহার করেছিল। এ প্রসঙ্গে, তৎকালীন
ফার্স্ট লেডি লরা বুশ একটি রেডিও ভাষণে যুক্তি দিয়েছিলেন যে, “সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে
লড়াই মানে নারীর অধিকারের জন্যও লড়াই।”
তবে, যুক্তরাষ্ট্র
ও তালেবানের মধ্যে ২০২০ সালের দোহা প্রক্রিয়ার আলোচনায় নারী ও মেয়েদের অধিকারের
কোনো উল্লেখ ছিল না। অধিকন্তু, তালেবানের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে আফগান নারীদের উপেক্ষা
করার জন্য ট্রাম্প প্রশাসন সমালোচিত হয়, কারণ সেই যোগাযোগে অধিকারের বিষয়গুলো স্পর্শ
করা হয় না। এর ফলে আফগানিস্তানের নারী ও মেয়েরা চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে।
ওয়াশিংটনের
জন্য এটি হয়তো “বাছাই করা” বা বিষয়-ভিত্তিক কূটনীতি, কিন্তু তালেবানের
জন্য এটি একটি বড় অনুপ্রেরণা। আলোচনার প্রতিটি পর্ব আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে একটি
স্পষ্ট বার্তা দেয় যে, প্রায় পাঁচ বছর ধরে নিষেধাজ্ঞা ও আন্তর্জাতিক চাপ থাকা সত্ত্বেও
তালেবানের কার্যত সরকারই আফগানিস্তান শাসন করছে। স্বীকৃতি পাক বা না পাক, বিদেশি কর্মকর্তাদের
সঙ্গে আলোচনার টেবিলে বসার সুযোগটা তালেবানরাই পায়।
আন্তর্জাতিক
সম্প্রদায়ের চাপের কাছে নতি স্বীকার না করে, তালেবানরা ধীরস্থিরভাবে দেশে তাদের শাসন
প্রসারিত করেছে। সময়ের সাথে সাথে সেই চাপও কমে এসেছে বলে মনে হয়। তালেবান সরকার গত
বছর তাদের সাবেক শত্রু, রাশিয়ার কাছ থেকেই প্রথম কূটনৈতিক স্বীকৃতি লাভ করে। গত দুই
বছরে আরেক সাবেক শত্রু, ভারতের সঙ্গেও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলেছে।
দ্য ডিপ্লোম্যাট থেকে অনুদিত