চলতি বছরের জানুয়ারিতে ভেনেজুয়েলায় সামরিক অভিযান চালায় যুক্তরাষ্ট্র। অভিযান চালিয়ে দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরো ও তাঁর স্ত্রীকে আটক করে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে আসে তারা। এরপর এক নজিরবিহীন চুক্তির মাধ্যমে ভেনেজুয়েলার ৬৫ বিলিয়ন ব্যারেল তেলসম্পদের ওপর সংখ্যাগরিষ্ঠ মার্কিন নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়। গতকাল মঙ্গলবার জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে দেওয়া ভাষণে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে সেই সামরিক অভিযান ও তেলচুক্তির মধ্যে সরাসরি যোগসূত্র টানলেন।
একমুহূর্তের জন্য
চোখের পলক
না ফেলে
ট্রাম্প বললেন,
‘যুদ্ধে যে
বিজয়ী, লুটের
মালামাল সে–ই পাবে, এটাই
নিয়ম। সে
কথা তো
আপনারা জানেন,
তাই না?’
ট্রাম্পের দাবি,
যুক্তরাষ্ট্র ও
ভেনেজুয়েলাকে একসঙ্গে
ধরলে বিশ্বের
৬০ শতাংশের
বেশি তেল
এখন তাদের
হাতে।
৮০ বছর
আগে জাতিসংঘ
প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল
যুদ্ধ ঠেকাতে,
আন্তর্জাতিক আইনের
শাসন প্রতিষ্ঠা
করতে, শান্তি
বিঘ্নিত হলে
সম্মিলিত ব্যবস্থা
নিতে। সেই
জাতিসংঘের মঞ্চে
দাঁড়িয়ে একজন
মার্কিন প্রেসিডেন্ট
বললেন, প্রয়োজনে
তিনি যুদ্ধ
করবেন। বিজয়ের
পুরস্কার হিসেবে
পরাজিত দেশের
মূল্যবান সম্পদে
ভাগ বসাবেন।
যেন এতে
প্রশ্নের কিছু
নেই, বিস্ময়েরও
কিছু নেই।
একই ভাষণে
ট্রাম্প আরও
বলেন, ‘প্রয়োজন
হলে যুক্তরাষ্ট্র
তার জাতীয়
স্বার্থ সুরক্ষায়
সামরিক শক্তি
ব্যবহার করবে।’ এই
শক্তি কতটা
অপ্রতিরোধ্য, তার
উদাহরণ হিসেবে
তিনি ইরানকে
টেনে আনলেন।
ট্রাম্পের ভাষায়,
‘আমাকে একটি
বড় সিদ্ধান্ত
নিতে হবে—ইরানের সঙ্গে
চুক্তি করব,
নাকি ইসলামিক
রিপাবলিককে নিশ্চিহ্ন
করে দেব।’
এরপর ট্রাম্প
প্রশ্ন করলেন,
ইরানকে কি
এমনভাবে ‘নরকে
পাঠাবেন’,
যাতে তার
টিকে থাকার
বা ভবিষ্যৎ
প্রজন্মের জন্য
কোনো আশা
না থাকে।
জাতিসংঘের মঞ্চে
ট্রাম্পের এমন
হুমকি অবশ্য
একেবারে নতুন
নয়। ২০১৭
সালে সাধারণ
পরিষদে তাঁর
প্রথম ভাষণেও
তিনি উত্তর
কোরিয়াকে ‘সম্পূর্ণ
ধ্বংস’
করার হুমকি
দিয়েছিলেন।
৯ বছর
পর ইরানকে
নিশ্চিহ্ন করার
হুমকি দিয়ে
ট্রাম্প বুঝিয়ে
দিলেন, এটি
কোনো তাৎক্ষণিক
মুখ ফসকানো
কথা নয়,
শক্তি প্রয়োগের
অধিকার সম্পর্কে
তাঁর দীর্ঘদিনের
বিশ্বাসেরই পুনরাবৃত্তি।
অথচ ২০১৭
সালের সেই
ভাষণে ট্রাম্প
বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র
কারও ওপর
নিজের জীবনধারা
চাপিয়ে দিতে
চায় না;
বরং শক্তিশালী,
স্বাধীন ও
সার্বভৌম রাষ্ট্রগুলো
পারস্পরিক সম্মানের
ভিত্তিতে পাশাপাশি
কাজ করবে।
কিন্তু গতকালের
ভাষণে সেই
সার্বভৌমত্বের ধারণাই
উল্টে গেল।
এখন যুক্তরাষ্ট্রের
সার্বভৌমত্ব নিরঙ্কুশ।
কিন্তু দুর্বল
দেশের সার্বভৌমত্ব
যুক্তরাষ্ট্রের ‘জাতীয়
স্বার্থের’
অধীন।
১৯৪৫ সালে
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের
ধ্বংসস্তূপের ওপর
দাঁড়িয়ে যে
বিশ্ব সংস্থা
গড়ে উঠেছিল,
তার অন্যতম
লক্ষ্য ছিল
একতরফা সামরিক
শক্তির বদলে
আলোচনা, মধ্যস্থতা
ও সম্মিলিত
নিরাপত্তার মাধ্যমে
বিরোধ মেটানো।
জাতিসংঘ সনদ
অন্য রাষ্ট্রের
বিরুদ্ধে শক্তি
প্রয়োগ বা
শক্তি প্রয়োগের
হুমকি নিষিদ্ধ
করেছে। এর
স্বীকৃত ব্যতিক্রম
দুটি—নিরাপত্তা পরিষদের
অনুমোদন অথবা
সশস্ত্র হামলার
মুখে প্রয়োজনীয়
ও আনুপাতিক
আত্মরক্ষা।
ভেনেজুয়েলা বা
ইরানের বিরুদ্ধে
মার্কিন অভিযানের
ক্ষেত্রে নিরাপত্তা
পরিষদের অনুমোদন
নেওয়া হয়নি।
এগুলোকে তাৎক্ষণিক
সশস্ত্র হামলার
জবাবে সীমিত
আত্মরক্ষামূলক পদক্ষেপ
হিসেবেও ট্রাম্প
উপস্থাপন করেননি।
বরং তাঁর
প্রকাশ্য যুক্তি
ছিল আরও
বিস্তৃত: যুক্তরাষ্ট্রের
জাতীয় স্বার্থ,
শত্রুর সম্ভাব্য
ভবিষ্যৎ আচরণ
ও বিজয়ের
পর অর্থনৈতিক
সুবিধা।
এ কারণেই
ট্রাম্পের ঘোষণা
এত উদ্বেগজনক।
কোনো সামরিক
সর্বাধিনায়ক তাঁর
সেনাদের উদ্দেশে
এ কথা
বলছিলেন না।
কোনো আসন্ন
হামলা ঠেকাতে
আক্রমণকারী দেশকেও
তিনি সতর্ক
করছিলেন না।
তিনি বলছিলেন
এমন একটি
মঞ্চে, যেখানে
সমবেত রাষ্ট্রনেতাদের
ঘোষিত উদ্দেশ্য
শান্তিপূর্ণ উপায়ে
বিরোধ মেটানো।
শুধু ‘জাতীয়
স্বার্থ’
দেখিয়ে অন্য
রাষ্ট্রে হামলা
কিংবা তার
সম্পদ দখলের
অধিকার দাবি
করা জাতিসংঘের
নীতি-আদর্শের
সম্পূর্ণ বিপরীত।
১৮২৩ সালের
মনরো ডকট্রিন
এবং পরে
বিংশ শতাব্দীর
গোড়ার প্রেসিডেন্ট
থিয়োডোর রুজভেল্টের
এক ঘোষণার
মাধ্যমে ওয়াশিংটন
পশ্চিম গোলার্ধকে
নিজের বিশেষ
স্বার্থবলয় হিসেবে
দেখতে শুরু
করে। উভয়
সিদ্ধান্ত লাতিন
আমেরিকায় মার্কিন
হস্তক্ষেপের রাজনৈতিক
যুক্তি জুগিয়েছিল।
গতকাল ট্রাম্প
সেই পুরোনো
মতবাদকে আরও
বিস্তৃত করলেন।
তিনি বললেন,
পশ্চিম গোলার্ধ
তো বটেই,
‘আমাদের অঞ্চল
এবং সারা
বিশ্বে’
প্রয়োজন হলে
যুক্তরাষ্ট্র সামরিক
শক্তি ব্যবহার
করবে। কোথায়,
কখন, কীভাবে
সেই শক্তি
প্রয়োগ হবে,
সিদ্ধান্ত নেবে
ওয়াশিংটন একাই।
ট্রাম্পের বহুপক্ষীয়তাবিরোধী
অবস্থান ভাষণের
অন্য অংশেও
স্পষ্ট ছিল।
তিনি আন্তর্জাতিক
অপরাধ আদালতকে
‘আমেরিকাবিরোধী’
আখ্যা দিয়ে
সদস্যরাষ্ট্রগুলোকে এই
আদালত ত্যাগ
করার আহ্বান
জানান।
উল্লেখ করা
দরকার, আদালতটি
জাতিসংঘের কোনো
অঙ্গ নয়।
রোম সংবিধির
ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত
একটি স্বাধীন
প্রতিষ্ঠান।
ট্রাম্প আন্তর্জাতিক
নৌ সংস্থার
প্রস্তাবিত বৈশ্বিক
কার্বন শুল্কের
বিরোধিতা করেন।
ইউনেসকোর সাংস্কৃতিক
ঐতিহ্য রক্ষার
ভূমিকার সঙ্গে
অভিবাসনবিষয়ক অবস্থান
জড়িয়ে আক্রমণ
করেন। কৃত্রিম
বুদ্ধিমত্তা নিয়ন্ত্রণে
কোনো আন্তর্জাতিক
ব্যবস্থাও তিনি
প্রত্যাখ্যান করেন।
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী
নির্বাচনের আগে
দেওয়া ট্রাম্পের
এই ভাষণের
শ্রোতা শুধু
বিশ্বনেতারা ছিলেন
না, দেশের
ভেতরের ভোটারদের
কথাও ট্রাম্পের
মাথায় ছিল।
ভাষণে কূটনীতি
বা বহুপক্ষীয়
সমঝোতার বদলে
ট্রাম্প নিজেকে
বিশ্বের সবচেয়ে
শক্তিশালী নেতা
হিসেবে তুলে
ধরতে চেয়েছেন।
তাঁর অনুগত
সমর্থকেরা তাঁকে
এভাবেই দেখতে
ভালোবাসেন।
সবশেষ রয়টার্স-ইপসস জরিপে ট্রাম্পের
প্রতি সমর্থন
নেমে এসেছে
৩২ শতাংশে।
অনুমান করা
যায়, সেই
সমর্থন কিছুটা
ফেরাতে তিনি
নিজেকে শুধু
যুক্তরাষ্ট্রের নয়,
যেন গোটা
বিশ্বের ‘কমান্ডার
ইন চিফ’ হিসেবে
হাজির করতে
চেয়েছেন।
ট্রাম্প অনেক
আগে থেকেই
জাতিসংঘভিত্তিক বহুপক্ষীয়
ব্যবস্থাকে দুর্বল
করার চেষ্টা
করছেন। গতকাল
তিনি আরও
এক ধাপ
এগোলেন।
জাতিসংঘের জন্ম
হয়েছিল এই
বিশ্বাস থেকে
যে সামরিক
বিজয় কোনো
দেশকে পরাজিত
জনগণের ভূমি
ও সম্পদের
মালিক বানায়
না। অথচ
সেই মঞ্চে
দাঁড়িয়েই ট্রাম্প
ঘোষণা করলেন,
বিজয়ীরই অধিকার
লুটের মালে।
দুর্বল হয়ে
পড়া বহুপক্ষীয়
ব্যবস্থার কফিনে
ট্রাম্প আরেকটি
পেরেক ঠুকে
গেলেন।
সূত্র: প্রথম
আলো