বাংলাদেশের জাতীয় ফল ও গাজীপুরের ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্য কাঁঠালের বৈশ্বিক বাণিজ্যিকীকরণে এক বিশাল মাইলফলক উন্মোচিত হয়েছে। সম্প্রতি জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আন্তর্জাতিক বাজারে বিশেষ করে চীনে বাংলাদেশি কাঁঠাল রপ্তানির সরকারি মেগা পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন। তাঁর এই ঘোষণার পর দেশের অন্যতম প্রধান কাঁঠাল উৎপাদনকারী জেলা গাজীপুরের চাষি ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে ব্যাপক উদ্দীপনা সৃষ্টি হয়েছে।
স্বাদে-গন্ধে অনন্য গাজীপুরের কাঁঠাল সম্প্রতি জিআই পণ্যের স্বীকৃতি
পাওয়ার পর প্রধানমন্ত্রীর এ
ঘোষণা বিশ্ববাজারে এর ব্র্যান্ডিং ও
স্থায়ী বাজার নিশ্চিতে একটি বৈপ্লবিক পদক্ষেপ
হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
সংসদ
সূত্রে জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রী
তারেক রহমান সাম্প্রতিক তাঁর চীন সফরে
বাংলাদেশি কাঁঠাল রপ্তানির লক্ষ্যে দেশটির সঙ্গে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ
দ্বিপাক্ষিক সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই করেছেন। চীনে
বাংলাদেশি কাঁঠালের বিপুল জনপ্রিয়তার কথা উল্লেখ করে
প্রধানমন্ত্রী জানিয়েছেন, খুব শীঘ্রই সরকারি
ও বেসরকারি সমন্বিত উদ্যোগে প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে বড় পরিসরে কাঁঠাল
রপ্তানি শুরু হবে। সরকারের
এ যুগান্তকারী পরিকল্পনা বাস্তবায়নে কাঁঠালের রাজধানী খ্যাত গাজীপুর জেলা এখন আলোচনার
মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। এরইমধ্যে চলতি ফল মৌসুমকে
কেন্দ্র করে জেলাজুড়ে উৎসবমুখর
ব্যস্ততা ও লাখ লাখ
টাকার কাঁঠাল কেনাবেচা চলছে।
গাজীপুরের
শ্রীপুর, কাপাসিয়া, কালীগঞ্জ, কালিয়াকৈর ও সদর উপজেলার
প্রতিটি গ্রামে বিপুল পরিমাণ কাঁঠাল গাছ থেকে ফল
সংগ্রহ চলছে। শ্রীপুরের ঐতিহ্যবাহী জৈনা বাজার বর্তমানে
জেলার বৃহত্তম কাঁঠালের হাট হিসেবে জমে
উঠেছে। প্রতিদিন ভোর থেকে গভীর
রাত পর্যন্ত হাজার হাজার কৃষক, পাইকার ও আড়তদারদের ভিড়ে
মুখরিত থাকে এ বাজার।
স্থানীয়
ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলাপকালে তারা জানান, বর্তমানে
কাঁঠালের ভরা মৌসুম চলছে।
বাজারে প্রচুর পরিমাণে কাঁঠাল আসছে। ফলে ক্রেতারা কম
দামে কাঁঠাল পাচ্ছেন। এখন দৈনিক ২৫
থেকে ৩০ লাখ টাকার
কাঁঠাল বেচাকেনা হচ্ছে। মৌসুসের শুরুতে তুলনামূলক কাঁঠালের মূল্য বেশি ছিল। তখন
দৈনিক ৭০ থেকে ৮০
লাখ টাকার কাঁঠাল বিক্রি হয়েছে।
পাইকারি
ব্যবসায়ী হামিদুর রহমান বাসস’কে বলেন,
শ্রীপুর উপজেলার জৈনা বাজার থেকে
সবচেয়ে বেশি কাঁঠাল যায়
নোয়াখালী অঞ্চলে। প্রতিদিন এ বাজার থেকে
ছেড়ে যাওয়া ২০টি বড় ট্রাকের
মধ্যে অন্তত ১০টি ট্রাকই নোয়াখালীর
বিভিন্ন এলাকার উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। এছাড়া
সিলেট, কুমিল্লা ও চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন
জেলায় প্রতিদিন প্রচুর পরিমাণে কাঁঠাল যাচ্ছে।
শ্রীপুর
জৈনা বাজারে ষাটোর্ধ আলী আকবর বাড়ির
উঠানে নিজ হাতে লাগানো
৫টি গাছ থেকে ৪৫টি
মাঝারি ও বড় সাইজের
কাঁঠাল নিয়ে আসেন বিক্রি
করতে।
তার
সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, একটি
গাছে ত্রিশ থেকে দুই শতাধিক
কাঁঠাল ধরে। মৌসুমের শুরুতে
প্রকারভেদে একটি কাঁঠালের দাম
৫০ টাকা থেকে ৪০০
টাকা ছিল। বর্তমানে তা
৩০ থেকে ১০০ টাকায়
কিক্রি হচ্ছে।
তিনি
বলেন, কাঁঠাল চাষে তেমন একটা
পরিশ্রম করতে হয় না।
উঁচু মাটিতে একবার একটি কাঁঠালের চারা
রোপণ করলে ৪-৫
বছর থেকে শুরু করে
৭০-৮০ বছর পর্যন্ত
অনায়াসে ফলন পাওয়া যায়।
কৃষি
সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গাজীপুর
জেলায় মোট ৯ হাজার
১২৫ হেক্টর (প্রায় ২২ হাজার ৫৫১
একর) জমিতে কাঁঠাল আবাদ হয়ে থাকে।
ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যের কারণে গাজীপুরের মাটি কাঁঠাল চাষের
জন্য অত্যন্ত উপযোগী।
এ বিষয়ে গাজীপুর জেলা প্রশাসক মো.
নূরুল করিম ভুঁইয়া বাসস’কে বলেন, কাঁঠাল
ও কাঁঠালজাত পণ্য বিদেশে রপ্তানির
প্রচেষ্টা চলছে। বর্তমানে এ খাতে প্রায়
৫০০ কোটি টাকার বাজার
রয়েছে, যা সুষ্ঠু প্রক্রিয়াজাতকরণ
ও বাজারজাতকরণের মাধ্যমে প্রায় ২ হাজার কোটি
টাকায় উন্নীত করা সম্ভব।
শ্রীপুর
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সুমাইয়া
সুলতানা বন্যা বাসস’কে বলেন,
এ উপজেলায় বছরে গড়ে প্রায়
৭৮ হাজার টন কাঁঠাল উৎপাদিত
হয়। প্রধানমন্ত্রীর ঐতিহাসিক চীন সফরের পর
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর এখন ইউরোপ ও
মধ্যপ্রাচ্যের পাশাপাশি চীনের বাজারেও গাজীপুরের কাঁঠাল পৌঁছানোর লক্ষ্যে জোরালোভাবে কাজ শুরু করেছে।
তিনি
বলেন, ফলের দীর্ঘমেয়াদী সংরক্ষণাগার
নির্মাণ ও আধুনিক প্রক্রিয়াজাতকরণ
শিল্প স্থাপনের যে নির্দেশনা প্রধানমন্ত্রী
দিয়েছেন, তা দ্রুত বাস্তবায়নের
দিকে এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
কৃষি
বিভাগ সংশ্লিষ্টরা জানান, গাজীপুরের কাঁঠাল কেবল একটি মৌসুমি
ফল নয়; এটি এ
অঞ্চলের হাজার হাজার সাধারণ মানুষ ও প্রান্তিক ক্ষুদ্র
উদ্যোক্তার জীবিকার সাথে জড়িয়ে থাকা
একটি অন্যতম অর্থনৈতিক ফসল। চলতি মৌসুমে
কাঁঠাল কেনাবেচাকে কেন্দ্র করে গ্রামীণ অঞ্চলে
কয়েক হাজার শ্রমিকের নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ
সৃষ্টি হয়েছে। তবে মাঠপর্যায়ের কৃষকদের
কিছু দুঃখও রয়েছে।
কাপাসিয়ার
সিংহশ্রী গ্রামের চাষি কবির হোসেন
বাসস’কে বলেন, উপযুক্ত
হিমাগার বা আধুনিক কোল্ড
স্টোরেজ না থাকায় প্রতি
বছর বিপুল পরিমাণ কাঁঠাল পঁচে নষ্ট হয়ে
যায়। এছাড়া কাপাসিয়া উপজেলার ১১টি ইউনিয়নের ৩২টি
হাটে মৌসুমি ফল বিক্রির জন্য
নির্দিষ্ট কোনো স্থায়ী শেড
বা আধুনিক বাজার ব্যবস্থা না থাকায় অতিরিক্ত
সরবরাহের দিনে কৃষকরা নামমাত্র
মূল্যে কাঁঠাল বিক্রি করতে বাধ্য হন।
প্রধানমন্ত্রীর
নতুন পরিকল্পনাকে স্বাগত জানিয়ে এলাকার ভুক্তভোগী চাষিরা সরকারি উদ্যোগে দ্রুত কোল্ড স্টোরেজ স্থাপন এবং কাঁঠালের জুস,
জ্যাম ও সুস্বাদু চিপস
তৈরির আধুনিক প্রক্রিয়াজাতকরণ কলকারখানা গড়ে তোলার দাবি
জানিয়েছেন।
আধুনিক
ও প্রক্রিয়াজাতকরণ কলকারখানা গড়ে তোলা হলে
আন্তর্জাতিক বাজারে যেমন উন্নত ও
স্বাস্থ্যসম্মতভাবে এ ফলটি পাঠানো
সম্ভব হবে, তেমনি দেশের
বাজারেও কৃষকরা ফসলের ন্যায্যমূল্য পাবেন।
কৃষি
সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা আশা প্রকাশ করছেন,
জিআই স্বীকৃতির ব্র্যান্ড ভ্যালু এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক
রহমানের নতুন দূরদর্শী বাজার
পরিকল্পনার যৌথ সমন্বয়ে গাজীপুরের
কাঁঠাল অদূর ভবিষ্যতে দেশের
অর্থনীতিতে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন
এনে দেবে এবং বিশ্ববাজারে
জাতীয় ফলের ঐতিহ্য সুপ্রতিষ্ঠিত
হবে।
বাসস