গোলাম সুফির কপালে ঠিক মাঝখানে একটি গাঢ় দাগ। তিনি জানান, নামাজ পড়ার কারণেই এই দাগ পড়েছে। আজ শুক্রবার, ভারতের শাসনাধীন কাশ্মীরের শ্রীনগর শহরের খানিয়ার এলাকায় নিজের বাড়িতে নামাজের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন সুফি।

নিজের মাথার টুপিটি সাবধানে ঠিক করতে করতে—যাতে তার নিচে থাকা পাতলা ধূসর চুলগুলো এলোমেলো না হয়ে যায়—তিনি বলেন, “কাশ্মীরে ইসলাম ও রাজনীতি সবসময়ই অবিচ্ছেদ্য ছিল। এবারও আমরা সেই যোগসূত্র টের পাচ্ছি।”

সুফি এখানে কাশ্মীরের ওয়াকফ বোর্ডের সাম্প্রতিক একটি নির্দেশের কথা বলছেন; এই বোর্ডটি ওই অঞ্চলের মুসলিম ধর্মীয় স্থানগুলোর দেখভাল করে।

১০ অক্টোবর, জম্মু ও কাশ্মীর ওয়াকফ বোর্ড—যার নেতৃত্বে রয়েছেন ড. সৈয়দ দরখশান আন্দ্রাবি (তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির হিন্দুত্ববাদী দল ভারতীয় জনতা পার্টির—বিজেপি—একজন কাশ্মীরি নেত্রী)—এই সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলের মসজিদ ও ধর্মীয় স্থানগুলোতে জুমার খুতবার (ধর্মীয় বয়ান) বিষয়বস্তু অভিন্ন করার প্রস্তাব দেয়। খুতবার বিষয়বস্তুকে এক ছাঁচে ফেলার এই খবর ছড়িয়ে পড়ার পরপরই, ধর্মীয় বিষয়ে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের অভিযোগে এটি তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে। স্থানীয়দের মতে, জুমার খুতবা নির্ধারণের জন্য বোর্ডের এই পরিকল্পনাটি আসলে তাদের বিশ্বাসের ওপর এক ধরনের আঘাত, যাকে ‘সমন্বয়’ নাম দিয়ে উপস্থাপন করা হচ্ছে।

ধর্মীয় বয়ানের ওপর নিয়ন্ত্রণ

খুতবার বিষয়বস্তু অভিন্ন করার এই নির্দেশটিকে বৃহত্তর রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে দেখা হচ্ছে।

২০১৯ সালে মোদি সরকার যখন কাশ্মীরের বিশেষ সাংবিধানিক মর্যাদা বাতিল করে অঞ্চলটিকে সরাসরি কেন্দ্রীয় শাসনের অধীনে নিয়ে আসে, তখন ওয়াকফ বোর্ডসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ব্যাপক আইনি ও প্রশাসনিক পরিবর্তন আনা হয়। উল্লেখ্য, এই ওয়াকফ বোর্ডই মুসলিম ধর্মীয় সম্পত্তি ও অনুদানগুলো পরিচালনা করে।

২০২২ সালে ভারতের কেন্দ্রীয় ওয়াকফ কাঠামোর অধীনে একটি নতুন বোর্ড গঠন করা হয় এবং বিজেপি নেত্রী আন্দ্রাবিকে এর চেয়ারপারসন হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। যদিও এই বোর্ডটি কাশ্মীরের হাজার হাজার মসজিদ ও ধর্মীয় স্থানের মধ্যে সরাসরি ১৫০টিরও কম স্থান পরিচালনা করে, তবুও তারা পুরো কাশ্মীরের সব মসজিদে জুমার খুতবা নিয়ে একটি উচ্চাভিলাষী প্রস্তাব সামনে এনেছে। এই অঞ্চলের শীর্ষ মুসলিম ধর্মীয় নেতা মিরওয়াইজ উমর ফারুক ‘দ্য ডিপ্লোম্যাট’-কে বলেন, “ওয়াকফ বোর্ডের শুক্রবারের খুতবা বা ধর্মোপদেশগুলোকে অভিন্ন করার উদ্যোগটি অত্যন্ত সমস্যাজনক; কারণ এটি মুসলিম সম্প্রদায়ের ধর্মীয় বিষয়ে হস্তক্ষেপের শামিল। মসজিদের মিম্বর একটি পবিত্র আমানত, আর ধর্মীয় দিকনির্দেশনা প্রদানের দায়িত্ব কেবল ইসলামি আলেম ও স্বীকৃত ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের ওপরই ন্যস্ত। সরকারিভাবে নিযুক্ত কোনো সংস্থার মাধ্যমে খুতবা চাপিয়ে দেওয়াটা এই ঐতিহ্যকে অবজ্ঞা করার নামান্তর এবং এটি ধর্মীয় স্বায়ত্তশাসনের বিষয়ে গুরুতর প্রশ্ন উত্থাপন করে।”

ফারুক এই ধরনের হস্তক্ষেপের বিষয়ে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, “মসজিদের মিম্বর রাষ্ট্রের কোনো হাতিয়ার নয়। প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এর বার্তা নিয়ন্ত্রণ বা নির্ধারণ করার যেকোনো প্রচেষ্টা অগ্রহণযোগ্য। আমাদের অবস্থান সমন্বয় বা সংস্কারের বিরুদ্ধে নয়, বরং রাষ্ট্রের এমন সব বিষয়ের ওপর কর্তৃত্ব আরোপের বিরুদ্ধে—যা প্রকৃতপক্ষে ধর্মীয় সম্প্রদায় ও তাদের আলেমদের এখতিয়ারভুক্ত।”

জম্মু ও কাশ্মীরের মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লাহ এই ধারণা এবং এর পেছনের উদ্দেশ্যটির সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেন, “এটি মুসলমানদের ধর্মীয় বিষয়ে বিজেপির একটি অগ্রহণযোগ্য হস্তক্ষেপের প্রচেষ্টা, যা কোনো অবস্থাতেই মেনে নেওয়া হবে না। বিজেপির নিয়োগ করা চেয়ারপারসনের উচিত, তার প্রভুদের খুশি করার এই ভুল পদক্ষেপটি অবিলম্বে বন্ধ করা।”

রাজনীতিবিদ থেকে শুরু করে এই অঞ্চলের বিভিন্ন ইসলামি ধারার ধর্মীয় নেতাদের পক্ষ থেকে তীব্র প্রতিক্রিয়ার মুখে আন্দরাবি পিছু হটতে বাধ্য হন। আন্দরাবি—যার ‘এক্স’ প্রোফাইলে মোদির সঙ্গে তার একটি ছবি রয়েছে—যদিও এই পদক্ষেপের পক্ষে সাফাই গেয়েছেন, তবে তিনি দাবি করেছেন যে এটি কেবল একটি প্রস্তাব ছিল, কোনো আনুষ্ঠানিক আদেশ জারি করা হয়নি।

তবে খুতবাগুলোকে অভিন্ন করার এই সম্ভাব্য উদ্যোগটিই একমাত্র ঘটনা নয়, যার মাধ্যমে উপত্যকায় ইসলামি প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রমে হস্তক্ষেপের চেষ্টা করা হয়েছে।

অধিকার কেড়ে নেওয়ার পরবর্তী পরিস্থিতি

২০১৯ সালে জম্মু ও কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা রদ করার পর, লেফটেন্যান্ট গভর্নরের (এলজি) প্রশাসন সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে তুলে নেয়। শুরুতেই, এলজি প্রশাসন ২১৫টি কমিউনিটি-চালিত ইসলামি স্কুল নিষিদ্ধ করে দেয়। পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে পরিচালিত এই স্কুলগুলো মূলত নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানদের শিক্ষা দিয়ে আসছিল।

৫ আগস্ট, ২০১৯-এর পরবর্তী সময়ে ভারতীয় রাষ্ট্র কেবল রাজনৈতিক নেতাদের আটক করা বা যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। ৩৭০ ধারা বাতিলের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের বিরোধিতা যেন গড়ে না ওঠে, তা নিশ্চিত করতে তারা কাশ্মীরের মসজিদ ও ধর্মীয় নেতাদের ওপর কঠোর নজরদারি শুরু করে। সেই সময়ে কর্তৃপক্ষ গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় স্থানগুলোতে জুমার নামাজ ও ঈদের জামাত আয়োজনে বাধা দেয়, মসজিদের বাইরে নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন করে, ধর্মীয় নেতাদের আটক করে এবং তাদের সেনা ক্যাম্পে তলব করে। সেখানে তাদের নির্দেশ দেওয়া হয় যেন তারা সাধারণ মানুষকে বিক্ষোভ না করার পরামর্শ দেন; পাশাপাশি তাদের সতর্ক করে দেওয়া হয় যে, ধর্মোপদেশ বা খুতবায় যেন ৩৭০ ধারা নিয়ে কোনো আলোচনা না করা হয়।

৫ আগস্টের ঠিক আগে পুলিশের একটি সার্কুলারে শ্রীনগর জুড়ে থাকা মসজিদ এবং সেগুলোর পরিচালনা কমিটি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য চাওয়া হয়েছিল। এটি এক ধরনের নজরদারির পরিবেশ তৈরি করে এবং স্পষ্ট করে দেয় যে, ভারতীয় রাষ্ট্র কাশ্মীরে বিদ্রোহের আশঙ্কার সাথে ইসলামি প্রতিষ্ঠানগুলোকে কতটা গভীরভাবে যুক্ত বলে মনে করে। মসজিদগুলোকে রাজনৈতিক সংগঠিত হওয়ার সম্ভাব্য কেন্দ্র হিসেবে দেখা হতে থাকে।

২০২৬ সালের জানুয়ারিতে পুলিশ নজরদারি কার্যক্রমের অংশ হিসেবে সব মসজিদ এবং এর সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রোফাইলিং (তথ্য সংগ্রহ ও তালিকাভুক্তকরণ) শুরু করে। কাশ্মীরের বিভিন্ন এলাকার মসজিদগুলোর ধর্মীয় নেতাদের কাছে এমন কিছু ফর্ম পূরণ করতে বলা হয়, যেখানে মসজিদে আসা ব্যক্তিদের নাম, ফোন নম্বর এবং প্রতিষ্ঠানের বিস্তারিত তথ্য চাওয়া হয়েছিল। এই প্রক্রিয়ার ফলে তারা এখন চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছেন—ভারতীয় রাষ্ট্র কাশ্মীরের এই ইসলামি স্থানগুলোকে ঠিক কীভাবে দেখছে, তা নিয়ে তারা সন্দিহান হয়ে পড়েছেন।

স্থানীয়রা বলছেন যে, রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে মসজিদ বা এর সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের তথ্য সংগ্রহের ঘটনা নতুন কিছু নয়, তবে এবারের এই তথ্য সংগ্রহের প্রক্রিয়াটি ছিল অত্যন্ত অনুপ্রবেশমূলক, যা সবার মধ্যে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। কর্তৃপক্ষ মসজিদের ভৌত কাঠামো, নির্মাণের খরচ, তহবিলের উৎস, মাসিক ব্যয় এবং আয়ের মতো তথ্য চেয়েছিল। এমনকি মসজিদের সাথে যুক্ত ব্যক্তিদের সম্পর্কেও অত্যন্ত বিস্তারিত ও ব্যক্তিগত তথ্য চাওয়া হয়েছিল—যার মধ্যে ছিল তাদের আর্থিক অবস্থা, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, পাসপোর্ট, এটিএম কার্ড এবং ক্রেডিট কার্ড সংক্রান্ত তথ্য। কাশ্মীর উপত্যকার জনসংখ্যার ৯৭ শতাংশেরও বেশি এবং ভারত-শাসিত জম্মু ও কাশ্মীরের জনসংখ্যার প্রায় ৬৮ শতাংশই মুসলিম।

চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে, ওয়াকফ বোর্ড তাদের ব্যবস্থাপনায় থাকা মাজারগুলোর ভেতরে ভক্তদের খাবার আনা, বিতরণ করা এবং পাখিদের খাওয়ানোর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এই পদক্ষেপটি তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে, কারণ এই বিষয়গুলো কাশ্মীরের মাজার সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ।

ওয়াকফ বোর্ড তাদের এই পদক্ষেপগুলোকে ধর্মীয় সম্পত্তি রক্ষা, স্বচ্ছতা বৃদ্ধি এবং কাশ্মীরের সুফি ঐতিহ্য সংরক্ষণের প্রচেষ্টা হিসেবে তুলে ধরছে। তবে, মুসলিম ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ যখন স্থানীয় তত্ত্বাবধায়কদের হাত থেকে ভারত-নিয়ন্ত্রিত আমলাতন্ত্রের হাতে চলে যায়, তখন কী ঘটতে পারে—তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রও বিষয়টিকে মুসলিমদের জন্য বিপজ্জনক বলে অভিহিত করেছে। ‘ইউএস কমিশন অন ইন্টারন্যাশনাল রিলিজিয়াস ফ্রিডম’ভারতের ওয়াকফ আইন নিয়ে বারবার সমালোচনা করেছে; তাদের মতে, এটি মুসলিমদের ধর্মীয় স্বায়ত্তশাসনের ওপর রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপের একটি বৃহত্তর প্রক্রিয়ার অংশ।

ধর্মান্তর, সংঘাত ও বিশৃঙ্খলা

২০২৪ সালের এপ্রিলে, উত্তর ভারতের হরিয়ানা রাজ্যের বাসিন্দা সন্দীপ কুমার কাশ্মীরের হজরতবাল মাজারে হাজার হাজার মানুষের উপস্থিতিতে স্বেচ্ছায় ইসলাম গ্রহণ করেন। হিন্দু ধর্ম থেকে ইসলামে ধর্মান্তরিত হওয়া কুমারের কাছে ইসলাম গ্রহণের শপথ পাঠ করান ড. কামালউদ্দিন ফারুকি, যিনি ২০১৮ সাল থেকে ওই মাজারের প্রধান ধর্মীয় নেতা (প্রধান ইমাম/খতিব) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন।

জম্মু ও কাশ্মীর পুলিশ দ্রুত ফারুকির বিরুদ্ধে একটি অভিযোগ দায়ের করে; তাদের দাবি, তিনি ‘জোরপূর্বক ধর্মান্তর’ প্রক্রিয়ায় নেতৃত্ব দিয়েছেন। পরবর্তীতে, ওয়াকফ বোর্ড—যার নেতৃত্বে রয়েছেন আন্দরাবি—ফারুকিকে তার পদ থেকে সরিয়ে দেয়। অথচ সন্দীপ কুমার নিজেই জানিয়েছিলেন যে, তিনি স্বেচ্ছায় ইসলাম গ্রহণ করেছেন। গত মাসে ফারুকি তার পদ ফিরে পাওয়ার আবেদন নিয়ে আদালতের দ্বারস্থ হন। তার পরিবার প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই মাজারে বংশানুক্রমিকভাবে ধর্মীয় প্রচারকের দায়িত্ব পালন করে আসছে।

ফারুকি বলেন, তাকে কেন্দ্র করে ঘটে যাওয়া এই ঘটনাটি কাশ্মীরিদের একটি বড় প্রশ্ন নিয়ে ভাবতে বাধ্য করবে: শেষ পর্যন্ত কাশ্মীরের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ভবিষ্যৎ কে নির্ধারণ করবে? তিনি বলেন, “আমাদের বিশ্বাস কোনো রাজনৈতিক প্রকল্প নয়। আমাদের মসজিদগুলো সরকারের কোনো হাতিয়ার নয়, আর প্রশ্ন তোলার অধিকারকে কখনোই অবিশ্বস্ততা বা আনুগত্যহীনতা বলে ভুল করা উচিত নয়।”

২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে হজরতবাল দরগায় ভারতের জাতীয় প্রতীক স্থাপন করা হলে তা উপাসকদের ক্ষুব্ধ করে তোলে। তাঁরা নতুন বসানো ফলকটি ধ্বংস করার চেষ্টা করেন, কারণ তাঁদের মতে, দরগায় এর কোনো স্থান নেই। এই ক্ষোভের মূল কারণ ছিল প্রতীকটিতে প্রাণীর প্রতিকৃতি থাকা, যা ইসলামি শিক্ষার পরিপন্থী—যেখানে মূর্তিপূজা নিষিদ্ধ। এই ঘটনাটি পবিত্র স্থানগুলোতে ধর্মীয় পবিত্রতা এবং রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব নিয়ে বিদ্যমান উত্তেজনাকে সামনে নিয়ে এসেছে।

হজরতবাল দরগা দীর্ঘকাল ধরেই এমন একটি স্থান, যেখানে ধর্মীয় ভক্তি, কাশ্মিরি রাজনৈতিক পরিচিতি এবং ভারতীয় শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের ধারাগুলো একে অপরের সঙ্গে মিশেছে।

এই দরগার রাজনৈতিক গুরুত্ব আশির দশকের শেষভাগে শুরু হওয়া সশস্ত্র বিদ্রোহের অনেক আগে থেকেই বিদ্যমান। পরবর্তী দশকগুলোতে কাশ্মিরি নেতারা এখানে বড় বড় রাজনৈতিক সমাবেশের আয়োজন করেছেন; আবার বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতারাও হজরতবাল থেকে বিক্ষোভের ডাক দিয়েছেন। ১৯৯৩ সালের অক্টোবরে, ভারতবিরোধী বিদ্রোহীরা দরগার ভেতরে আশ্রয় নিলে ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনী স্থানটি ঘিরে ফেলে। এর ফলে দীর্ঘ অচলাবস্থা তৈরি হয় এবং ‘অল পার্টি হুরিয়াত কনফারেন্স’-এর ডাকে ৩৫ দিনব্যাপী ধর্মঘট পালিত হয়।

২০০৮ সালের জুলাই মাসে, কাশ্মিরের অন্যতম প্রধান স্বাধীনতা-পন্থী নেতা সৈয়দ আলী শাহ গিলানির আহ্বানে সাড়া দিয়ে শাবির আহমদ শাহ ও মোহাম্মদ আশরাফ সেহরিসহ বেশ কয়েকজন বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতা হজরতবালে হাজার হাজার মানুষের উদ্দেশ্যে ভাষণ দেন।

২০১৬ সালে, চরমপন্থী গোষ্ঠী হিজবুল মুজাহিদিনের কমান্ডার বুরহান ওয়ানি নিহত হওয়ার পর সৃষ্ট অস্থিরতার সময়, ‘জয়েন্ট রেজিস্ট্যান্স লিডারশিপ’—যার নেতৃত্বে ছিলেন গিলানি, মীরওয়াইজ উমর ফারুক এবং জম্মু ও কাশ্মির লিবারেশন ফ্রন্টের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ ইয়াসিন মালিক—হজরতবালে জুমার নামাজ আদায়ের জন্য একটি পদযাত্রার ডাক দেয়। সেখানে তারা বিক্ষোভে নিহতদের স্মরণে একটি জনসভারও আয়োজন করে।

কাশ্মিরে, যেখানে ধর্মীয় পরিচিতি রাজনৈতিক স্বায়ত্তশাসন ও সাংস্কৃতিক অস্তিত্বের দীর্ঘ সংগ্রামের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে আছে, সেখানে ধর্মীয় উপাসনালয়ের মিম্বরগুলো প্রায়শই রাজনৈতিক সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে। তবে ফারুকি উল্লেখ করেন, রাজনৈতিক প্রভাব যে কাশ্মিরের মসজিদ ও দরগাগুলোর ব্যবস্থাপনাকে বদলে দিচ্ছে—এই উদ্বেগের বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই।

তিনি বলেন, “তবে একটি নীতি অবশ্যই অটল থাকা উচিত: বিজেপি বা অন্য কোনো রাজনৈতিক দলেরই প্রশাসনিক ক্ষমতা ব্যবহার করে কাশ্মিরের ধর্মীয় জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করার সুযোগ থাকা উচিত নয়।” “আমাদের মসজিদগুলো কি আইন ও জনগণের ইচ্ছায় পরিচালিত হচ্ছে, নাকি কোনো রাজনৈতিক এজেন্ডায়? কাশ্মীরের বিশ্বাসকে রাজনৈতিক ক্ষমতার কাছে জিম্মি করে রাখা যায় না। জনগণ নীরবতা নয়, বরং উত্তর পাওয়ার অধিকার রাখে।”

দ্য ডিপ্লোম্যাট, ইংরেজি থেকে অনুবাদ