দেশের সার্বভৌমত্ব, ভূখণ্ডগত অখণ্ডতা এবং জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীকে সম্পূর্ণ আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর ও স্বাবলম্বী করে গড়ে তোলার এক মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে সরকার। এই মহাপরিকল্পনার অংশ হিসেবে আগামী ১০ বছরে শুধু বাংলাদেশ সশস্ত্র সক্ষমতা উন্নয়ন ও আধুনিকায়নেই প্রয়োজন হবে প্রায় ৮৬ হাজার কোটি টাকা।
একই
সঙ্গে বিদেশি নির্ভরতা কমিয়ে সম্পূর্ণ স্বনির্ভর ‘মেইড ইন বাংলাদেশ’
প্রতিরক্ষা শিল্প গড়ে তুলতে দেশে
আলাদা ‘ডিফেন্স ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন’ স্থাপন এবং
বগুড়ায় ড্রোন বা ইউএভি ম্যানুফ্যাকচারিং
প্ল্যান্ট তৈরির মতো যুগান্তকারী উদ্যোগ
নেওয়া হয়েছে।
বুধবার
(০৮ জুলাই) জাতীয় সংসদে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় প্রশ্নোত্তর পর্বে সরকারের এই কর্মপরিকল্পনার বিস্তারিত
তথ্য জানান প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা
তারেক রহমান।
স্থল
ও আকাশ প্রতিরক্ষায় সেনাবাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধি
সংসদ
নেতা বলেন, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সামগ্রিক যুদ্ধ সক্ষমতা বহুগুণ বৃদ্ধির লক্ষ্যে ৩ বছর মেয়াদি
এবং পরবর্তী ৭ বছর মেয়াদি
দুটি বিশেষ পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। এই
দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার আওতায় সেনাবাহিনীতে অত্যাধুনিক ট্যাংক ও সাঁজোয়া যুদ্ধযান
সংযোজন করে স্থলযুদ্ধ সক্ষমতাকে
আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করা
হবে। একই সঙ্গে দূরপাল্লায়
নিখুঁত ও নির্ভুল আঘাত
হানার সক্ষমতা অর্জনের জন্য আধুনিক আর্টিলারি,
শক্তিশালী রকেট ব্যবস্থা এবং
আধুনিক ট্যাংক বিধ্বংসী অস্ত্র যুক্ত করার প্রক্রিয়া চলমান
রয়েছে। দেশের আকাশসীমাকে সম্পূর্ণ সুরক্ষিত রাখতে সেনাবাহিনীতে স্বল্প ও মধ্যম পাল্লার
অত্যাধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা
বা সারফেস-টু-এয়ার মিসাইল
সিস্টেম সংযোজন করা হচ্ছে।
এছাড়া
আধুনিক যুদ্ধের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হিসেবে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, সার্বক্ষণিক
পর্যবেক্ষণ ও রণক্ষেত্রের পরিস্থিতি
দ্রুত অনুধাবনের জন্য সেনাবাহিনীতে মনুষ্যবিহীন
আকাশযান বা আনম্যান্ড এরিয়াল
ভেহিকল এবং কাউন্টার-ইউএভি
ব্যবস্থা ও আধুনিক নজরদারি
প্রযুক্তি যুক্ত করা হবে। এর
পাশাপাশি বিমানে করে ঝটিকা অভিযান
পরিচালনা, আকাশপথে দ্রুত সৈন্য ও ভারী সামরিক
সরঞ্জাম স্থানান্তর এবং নদীপথে কৌশলগত
পরিবহনের বিশেষ সক্ষমতা অর্জনের মাধ্যমে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কৌশলগত ও অপারেশনাল গতিশীলতা
আরও সুদৃঢ় করার সুনির্দিষ্ট উদ্যোগ
নেওয়া হয়েছে।
দীর্ঘমেয়াদি
যুদ্ধ প্রস্তুতি ও গোলাবারুদের বিশাল মজুদ
সরকার
প্রধান জানান, যেকোনো আকস্মিক সংকটকালীন পরিস্থিতিতে সেনাবাহিনীর যুদ্ধ স্থায়িত্ব ও অপারেশনাল কার্যকারিতা
দীর্ঘ সময় টিকিয়ে রাখার
জন্য ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে। এর
অংশ হিসেবে যুদ্ধকালীন প্রয়োজনীয়তা ও দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ
পরিচালনা সক্ষমতা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন প্রকার
আধুনিক সমরাস্ত্র এবং গোলাবারুদের বিশাল
মজুদ গড়ে তোলার পরিকল্পনা
নেওয়া হয়েছে। এর আওতায় আর্টিলারি
গোলাবারুদ, এমএলআরএস রকেট, ট্যাংকের উন্নত গোলাবারুদ এবং অ্যান্টি-ট্যাংক
গাইডেড মিসাইলসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সামরিক উপকরণের প্রয়োজনীয় রিজার্ভ বা মজুদ নিশ্চিত
করা হবে। যেন যেকোনো
দেশের যেকোনো আগ্রাসন বা প্রতিকূল পরিস্থিতিতে
বাহিনী স্বয়ংসম্পূর্ণভাবে লড়াই চালিয়ে যেতে
পারে।
ব্লু-ওয়াটার
নেভি গঠন
তিনি
বলেন, দেশের বিশাল সমুদ্রসীমার সার্বভৌমত্ব রক্ষা, জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং সমুদ্রে সি
সার্ভেইল্যান্স বা নজরদারি বৃদ্ধির
লক্ষ্যে বাংলাদেশ নৌবাহিনীকে একটি আধুনিক, দক্ষ
ও যুগোপযোগী ত্রিমাত্রিক বাহিনীতে রূপান্তরের কার্যক্রম পূর্ণ গতিতে এগিয়ে চলছে। বর্তমানে নৌবাহিনীর সারফেস ফ্লিটের দায়িত্বপ্রাপ্ত আধুনিক জাহাজসমূহ এবং বিশেষ আকাশযানগুলো
বঙ্গোপসাগরে সার্বক্ষণিক নজরদারি ও টহল কার্যক্রম
পরিচালনা করছে। ভবিষ্যতে নৌবাহিনীর এই সক্ষমতা আরও
বাড়াতে বহরে যুক্ত করা
হচ্ছে অত্যাধুনিক ফ্রিগেট, করভেট, অফশোর প্যাট্রোল ভেসেল শ্রেণির আধুনিক যুদ্ধজাহাজ এবং সাবমেরিন।
সমুদ্রের
সুরক্ষায় আধুনিক প্রযুক্তির অংশ হিসেবে বিভিন্ন
ধরনের মনুষ্যবিহীন প্ল্যাটফর্ম বা ড্রোন নৌবাহিনীতে
সংযোজন করা হবে। নৌবাহিনীর
কৌশলগত অবস্থান ও সক্ষমতা বাড়াতে
নতুন নতুন নৌঘাঁটি নির্মাণ
এবং বিদ্যমান ঘাঁটিসমূহের আধুনিক অবকাঠামোগত উন্নয়ন করা হচ্ছে। নৌবাহিনীর
কর্মকর্তা ও নাবিকদের আন্তর্জাতিক
মানের উন্নত প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করতে মানবসম্পদ উন্নয়ন,
বৈশ্বিক সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং বন্ধুপ্রতীম দেশগুলোর
সঙ্গে যৌথ সামরিক মহড়া
সম্প্রসারণের পরিকল্পনাও এই মহাপরিকল্পনার অন্তর্ভুক্ত
রয়েছে।
ফোর্সেস
গোল ও বিমান বাহিনীর ফাস্ট ট্র্যাক প্রজেক্ট
তারেক
রহমান বলেন, দেশের আকাশসীমার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ‘ফোর্সেস গোল-২০৩০’ এর
আওতায় বাংলাদেশ বিমান বাহিনীকে আধুনিক প্রযুক্তির চতুর্থ প্রজন্মের মাল্টি রোল কম্ব্যাট এয়ারক্রাফট
বা এমআরসিএ, শক্তিশালী ফাইটার এয়ারক্রাফট এবং আধুনিক সমরাস্ত্রে
সজ্জিত অ্যাটাক হেলিকপ্টার দিয়ে সুসজ্জিত করা
হচ্ছে। একইসঙ্গে যুক্ত হচ্ছে ভিআইপি হেলিকপ্টার, অ্যান্টি-ড্রোন সিস্টেম, অত্যাধুনিক ইউএভি সিস্টেম এবং ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার
সিস্টেম।
এছাড়া
শত্রু পক্ষের রাডার ও যোগাযোগ ব্যবস্থাকে
ফাঁকি দিতে কিংবা শনাক্ত
করতে প্যাসিভ ডিটেকশন সিস্টেম এবং আকাশ প্রতিরক্ষাকে
অভেদ্য করতে মিডিয়াম রেঞ্জ
সারফেস টু এয়ার মিসাইল
বা এমএসএএম সিস্টেম ও লং রেঞ্জ
এয়ার ট্রাফিক সার্ভিস রাডার সংযোজনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। দেশের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা
ও অত্যাধুনিক নজরদারি প্রযুক্তি সংযোজনের বিষয়টিকে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বিবেচনা করে
‘ফাস্ট ট্র্যাক’ প্রক্রিয়ায় অতি দ্রুত বাস্তবায়নের
বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বগুড়ায়
ড্রোন কারখানা ও দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্প নীতি
প্রধানমন্ত্রী
বলেন, প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ আত্মনির্ভরতা অর্জনের লক্ষ্যে বিদেশি প্রযুক্তির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে
দেশীয় উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধির এক ঐতিহাসিক উদ্যোগ
নিয়েছে সরকার। এরই অংশ হিসেবে
বড় ধরনের প্রযুক্তি স্থানান্তরের মাধ্যমে বৃহত্তর বগুড়াতে বিমান বাহিনীর তত্ত্বাবধানে একটি আধুনিক ইউএভি
বা ড্রোন ম্যানুফ্যাকচারিং প্ল্যান্ট স্থাপনের কার্যক্রম ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। পাশাপাশি
স্বনির্ভর ‘মেইড ইন বাংলাদেশ’
প্রতিরক্ষা শিল্প গড়ে তোলার লক্ষ্যে
একটি যুগোপযোগী দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্পনীতি প্রণয়নের কাজ চলমান রয়েছে,
যা দেশীয় শিল্পের স্বনির্ভরতার পথরেখা নির্ধারণ করবে। এই মহাপরিকল্পনার আলোকে
স্থানীয় প্রতিরক্ষা শিল্প নির্মাণের জন্য দেশের একটি
নির্দিষ্ট অঞ্চলে আলাদা ‘ডিফেন্স ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন’ বা সামরিক
শিল্পাঞ্চল স্থাপনের পরিকল্পনা সরকারের সক্রিয় বিবেচনাধীন রয়েছে।
সমরাস্ত্র
উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতার লক্ষ্য
তিনি
বলেন, বর্তমানে দেশীয় পর্যায়ে বিভিন্ন সামরিক উৎপাদন, মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ প্রতিষ্ঠানের
সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের গোলাবারুদ, উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন বিস্ফোরক
দ্রব্য, ক্ষুদ্র অস্ত্রের বিভিন্ন উপকরণ, সামরিক যানবাহনের প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ, আধুনিক যোগাযোগ সরঞ্জাম, পোশাক এবং সুরক্ষা সামগ্রী
উৎপাদন ও সংযোজন কার্যক্রম
সফলভাবে পরিচালিত হচ্ছে।
ভবিষ্যতে
দেশেই ফিউজ ও প্রাইমার,
আধুনিক অ্যাসল্ট রাইফেল, অ্যান্টি-ট্যাংক গাইডেড মিসাইল, বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট এবং উচ্চমানের হেলমেটসহ
বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সামরিক সরঞ্জামের উৎপাদন অবকাঠামো ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা
গড়ে তোলা হবে। এর
ফলে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় হওয়ার পাশাপাশি দেশের নিজস্ব প্রতিরক্ষা শিল্পের বিকাশ ঘটবে এবং দীর্ঘমেয়াদে
সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ ব্যবস্থার স্থায়ী নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে। এই লক্ষ্যে
দেশের শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং শিল্পখাতের সঙ্গে
সশস্ত্র বাহিনীর সমন্বিত সহযোগিতার পরিবেশ তৈরি করা হচ্ছে,
যেন দক্ষ প্রকৌশলী, বিজ্ঞানী
ও প্রযুক্তিবিদ তৈরির মাধ্যমে উন্নত ড্রোন প্রযুক্তি, আধুনিক সেন্সর ব্যবস্থা ও ইলেকট্রনিক্স তৈরিতে
দেশ স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে পারে।
তরুণদের
সামরিক বাহিনীতে টানতে বিশেষ উদ্যোগ
সরকার
তার নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী দেশের যুবসমাজকে জাতীয় নিরাপত্তা, সংকট মোকাবিলা এবং
একটি সক্ষম ও সুশৃঙ্খল মানবসম্পদ
হিসেবে গড়ে তুলতে একটি
দেশব্যাপী সমন্বিত কর্মসূচি প্রণয়ন করছে বলে জানান
সরকার প্রধান। তিনি বলেন, এই
পরিকল্পনাটি শুধুমাত্র নির্দিষ্ট কোনো জেলা বা
অঞ্চলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং বৃহত্তর
রংপুরের পীরগাছা ও কাউনিয়া উপজেলাসহ
সমগ্র বাংলাদেশের প্রতিটি উপজেলার তরুণদের যোগ্য সামরিক প্রার্থী হিসেবে গড়ে তুলতে সমানভাবে
বিস্তৃত হবে।
এছাড়া
বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমান বাহিনীর
নিয়োগ সংক্রান্ত সকল তথ্য জনগণের
দোরগোড়ায় নিখুঁতভাবে পৌঁছে দেওয়ার জন্য বিভিন্ন জাতীয়
গণমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং স্থানীয় প্রশাসনের
সহায়তায় ব্যাপক প্রচার কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। দেশের
প্রতিটি প্রান্তের যোগ্য, মেধাবী এবং দেশপ্রেমিক তরুণ-তরুণীদের দেশের সশস্ত্র বাহিনীতে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার মাধ্যমে জাতীয়
প্রতিরক্ষায় সমান সুযোগ সৃষ্টিতে
সরকার সম্পূর্ণ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বলে জানান প্রধানমন্ত্রী
তারেক রহমান।