দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মানি-ইটালিকে মানবতাবিরোধী অপরাধী নাতসি ও ফ্যাসিস্টমুক্ত করতে এতোটুকু বেগ পেতে হয়নি। অথচ ২০২৪ সালের ৫ অগাস্টের পর বাংলাদেশকে মানবতাবিরোধী অপরাধী ফ্যাসিস্টমুক্ত করা সম্ভব হয়নি। উপরন্তু ২০২৪-এর জুলাই বিপ্লবটিকে ব্যর্থ ও অর্থহীন প্রমাণে সক্রিয় রয়েছে ফ্যাসিস্ট দোসর ও তাদের কালচারাল উইং।
জার্মানি-ইটালির
কেসস্টাডির সঙ্গে বাংলাদেশ কেসস্টাডির পার্থক্যের জায়গাটা হচ্ছে; জার্মানি-ইতালির নাতসি
ও ফ্যাসিস্টদের সমর্থক কোন বৃহত রাষ্ট্র ছিলো না। কিন্তু বাংলাদেশের আওয়ামী ফ্যাসিস্ট
ও কালচারাল ফ্যাসিস্টদের সমর্থক হিসেবে রয়েছে বৃহত রাষ্ট্র হিন্দুত্ববাদী ভারত।
আওয়ামী লীগের
মানবতাবিরোধী অপরাধীদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দেয়া থেকে শুরু করে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে কথিত
মিডিয়া, বুদ্ধিজীবী, শিক্ষক, সাংবাদিক, সংস্কৃতিকর্মীদের প্রণোদনা দিয়ে ইন্ডিয়া তার
ছায়া উপনিবেশ ধরে রাখার চেষ্টা করছে।
ইন্ডিয়ার এই
ছায়া উপনিবেশের লক্ষ্য হচ্ছে; ইন্ডিয়াতে হিন্দুত্ববাদীরা যেভাবে সংখ্যালঘু মুসলমানদের
ভাগ্যনিয়ন্তা; বাংলাদেশে একইভাবে ইন্ডিয়ার হিন্দুত্ববাদের মন্ত্রে দীক্ষিত কালচারাল
ফ্যাসিস্টেরা হবে সংখ্যাগরিষ্ট মুসলমানের ভাগ্যনিয়ন্তা।
আদিম কাস্ট
সিস্টেমে বুঁদ কলকাতার কালচারাল উইং বৃটিশ আমলে নির্ধারণ করেছিলো, কোন মুসলমান যদি
শিক্ষা ও চাকুরি পেতে চায়; তবে তাকে 'অসাম্প্রদায়িক' হতে হবে। এই অসাম্প্রদায়িকতার
অর্থ হচ্ছে হিন্দুত্ববাদকে প্রগতিশীলতা হিসেবে মানতে হবে; আর ইসলামকে মৌলবাদ ও উগ্রপন্থার
প্রতিশব্দ হিসেবে ভাবতে শিখতে হবে।
খ্যাতিমান লেখিকা
তসলিমা নাসরিন যেভাবে হিন্দুত্ববাদকে প্রগতিশীলতা হিসেবে ভাবতে শিখেছেন আর ইসলামকে
মৌলবাদের সমার্থক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার ক্ষেত্রে সক্রিয় থেকেছেন।
গতকাল কলকাতার
রবীন্দ্র সদনে পশ্চিমবঙ্গের হিন্দুত্ববাদী মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী লেখিকা তসলিমা
নাসরিনকে সাহিত্য সম্রাট বংকিম চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়-এর পোট্রেট উপহার দিয়েছেন। এই বংকিমচন্দ্রই
বৃটিশ আমলে হিন্দুত্ববাদের বুদ্ধিবৃত্তিক সেনাপতি হিসেবে মুসলমানদের অপরায়ন করেছিলেন।
ডয়চেভেলের এক
সাংবাদিক তসলিমা নাসরিনকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, পশ্চিমবঙ্গের হিন্দুত্ববাদী সরকার সম্পর্কে
আপনার কোন সমালোচনা আছে কি! তসলিমা উত্তর দেন, সব মৌলবাদের সমালোচনা করা আমার দায়িত্ব
নয়।
ইন্ডিয়ায় ১৪
বছর ধরে রাষ্ট্রক্ষমতায় রয়েছে এমন হিন্দুত্ববাদী মৌলবাদের সমালোচনা করা তসলিমার দায়িত্ব
নয়। বাংলাদেশে রাষ্ট্র ক্ষমতায় যায়নি এমন ইসলামপন্থী মৌলবাদের সমালোচনা করাই তার একমাত্র
দায়িত্ব। আর সেটাই তসলিমা নাসরিনের কাছে প্রগতিশীলতা।
প্রগতিশীলতার
এই ধারণাটিকেই ইন্ডিয়া তার প্রণোদনা ও অনুপ্রেরণার মাধ্যমে বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
বাংলাদেশের প্রত্যন্ত এলাকা থেকে ঢাকায় আসা কিংবা ঢাকারই জীবন সংগ্রামে ধস্ত মুসলিম পরিবার থেকে কারওয়ান বাজারে আসা নিম্ন ও নিম্ন মধ্যবিত্ত
ঘরের ছেলে-মেয়েরা ইন্ডিয়ান প্রগতিশীলতার এই শিবব্রত পাঠ লাভ করে যে, মৌলবাদ মানে ইসলামপন্থা।
কন্ঠশীলনের
মাধ্যমে কলকাতার আঞ্চলিক ভাষা শিক্ষা, ফতুয়া ও কুঁচি দেয়া শাড়ি পরে রবীন্দ্র সংগীত
শুনে আহাউহু করা, মিডিয়ার নিউজরুমকে কালী মন্দিরের রুপে গড়ে তোলা, চারুকলা বলতে কেবলই
শিবব্রত কলা শিক্ষা; এর মাধ্যমে নিম্ন মধ্যবিত্ত ঘরের ছেলে মেয়ে জোড়া সাঁকোর ঠাকুর
পরিবারের আভিজাত্য অনুকরণ করে; ২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে অখণ্ড ভারতের স্বপ্নে মশগুল
হয়ে পড়ে। শেখ হাসিনার ফ্যাসিজমকে উন্নয়নের দেবী হিসেবে তৈরি করেছে এই কালচারাল ফ্যাসিস্টেরা।
প্রতিটি ইজমের
অন্ধ সমর্থনে যুক্তি বিবর্জিত কট্টর জনগোষ্ঠী দেশে দেশে রয়েছে। জায়নিজম, হিন্দুত্ববাদ,
মুসলিম ব্রাদারহুড, ফার রাইট খ্রিশ্চিয়ান, অন্ধ কমুনিস্ট, অন্ধ ক্যাপিটালিস্ট চোখে
পড়ে দেশে দেশে।
কিন্তু বাংলাদেশের
হিন্দুত্ববাদী প্রগতিশীলদের একমাত্র কাজ বাংলাদেশের পুরো মুসলমান জনগোষ্ঠীকে মৌলবাদী
তকমা দিয়ে ভারতের মুসলিম জনগোষ্ঠীর মতো চাপা দিয়ে রাখা।
এই হিন্দুত্ববাদী
প্রগতিশীল এক চোখে দেখে। ফলে সে দাড়ি টুপিওয়ালার সেক্স স্ক্যান্ডাল নিয়ে হাকালুকি করে।
আর ক্লিন শেভড লোকের সেক্স স্ক্যান্ডাল এলে মিডিয়ায় লিখতে থাকে, এই ভিডিও এ আই দিয়ে
তৈরি।
জুলাই বিপ্লবের
পর ৫ অগাস্ট সাঁঝ থেকে হিন্দুত্ববাদী প্রগতিশীল গোষ্ঠীটি ভারতের গোদি মিডিয়ার প্রোপাগান্ডা,
'বাংলাদেশে ইসলামপন্থা'-র উত্থান ঘটেছে; এই বাক্যটিকে 'সত্য' হিসেবে প্রতিষ্ঠায় মরিয়া।
এই বাক্যটিকে ঘাড়ে করে বয়ে নিয়ে যাবার জন্য পশ্চিমবঙ্গের হিন্দুত্ববাদী সরকার গতকাল
তসলিমা নাসরিনকে 'সেক্টর কমান্ডার' হিসেবে অভিষিক্ত করেছে।
যে কোন ধর্ম
ও রাজনৈতিক বিশ্বাসের অন্ধ সমর্থক মার্সিনারি হিসেবে কাজ করে। ফলে ইন্ডিয়ার হিন্দুত্ববাদী
সরকার আফগানিস্তানের তালিবানদের সঙ্গে যূথবদ্ধ হয়েছে। তাই বাংলাদেশে যারা আফগান তালেবানপন্থী
তারা ইন্ডিয়ার সঙ্গে যূথবদ্ধ। তারা ইন্ডিয়ান মিডিয়ার 'বাংলাদেশে ইসলামাইজেশন' শীর্ষক
প্রোপাগান্ডাকে বাস্তবতা দিতে নৈরাজ্য তৈরি করেছে। অমনি বাংলাদেশের হিন্দুত্ববাদী মৌলবাদীরা,
বাংলাদেশ ইসলামী মৌলবাদে ভরে গেলো গো বলে কোরাস গান গেয়েছে।
ইন্ডিয়ার ছায়া
উপনিবেশের কালচারাল হেজিমনি আর তার তৈরি করা ফুটসোলজারদের নিয়ত প্রোপাগান্ডার কারণে;
বাংলাদেশে বি-আওয়ামীকরণ প্রায় অসম্ভব। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মানি ও ইটালির নাতসি-ফ্যাসিস্ট
সমর্থক বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাপক, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, পুলিশ-প্রশাসক, কালচারাল ফ্যাসিস্ট
ও কমফর্ট উইমেনদের শাস্তি হলে তাদের পক্ষে কলম ধরার মতো লোকজন ছিলো না। কিন্তু বাংলাদেশে
ইন্ডিয়ান কালচারাল কলোনির এতো মজদুর ধাপে ধাপে সাজানো রয়েছে যে; জুলাই-এ নিহত ১৪০০
শিশু-তরুণ-তরুণীর আত্মত্যাগ; হাজার হাজার তরুণের পঙ্গুত্ব ও অন্ধত্ব বরণের বিষাদ সিন্ধুতে
দাঁড়িয়ে; জুলাই ব্যর্থ হয়েছে-ফিরিয়ে দাও ইন্ডিয়ান অরণ্য বলে হাপুস নয়নে কাঁদার মতো
সহমত-শিবব্রত-ললিতা-আনারকলি থই থই করছে এই জনপদে।
ফেসবুক টাইমলাইন থেকে