মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মিত্রদের মধ্যে সংঘাত আরও ছড়িয়ে পড়ার মধ্যে ইয়েমেনের ইরানপন্থী হুথি বিদ্রোহীরা সৌদি আরবের তেল স্থাপনা লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানোর দাবি করেছে।
শনিবার (২৫
জুলাই) এক ভিডিও বার্তায় হুথিদের সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি জানান, তারা
সৌদি তেল কোম্পানি আরামকোর
জিজান ও ইয়ানবু এলাকার
স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে।
তিনি
হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, সৌদি
আরব যদি তাদের বিরুদ্ধে
হামলা চালায়, তাহলে হুথিদের পাল্টা জবাব আরও ব্যাপক
হতে পারে।
এর আগে হুথি বিদ্রোহীদের
গণমাধ্যম জানিয়েছিল, জিজানে চালানো হামলার পর সেখানে আগুন
ধরে যায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে
ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিও
এএফপি যাচাই করে দেখেছে। ভিডিওতে
শহরটির আরামকোর মালিকানাধীন একটি তেল শোধনাগারের
ওপর থেকে কালো ধোঁয়ার
কুণ্ডলী দেখা যায়।’
সৌদি
আরব হামলার বিষয়ে সরাসরি কোনো মন্তব্য করেনি।
তবে দেশটির বেসামরিক প্রতিরক্ষা বিভাগ জিজান ও ইয়ানবু এলাকায়
সতর্কতা জারি করেছে।
গ্রিক
বিমান বাহিনীর কার্যালয় জানিয়েছে, শনিবার সকালে সৌদি আরবে মোতায়েন
গ্রিক বাহিনীর পরিচালিত একটি আকাশ প্রতিরক্ষা
ব্যবস্থা ইয়ানবুকে লক্ষ্য করে ইয়েমেন থেকে
ছোড়া দুটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র
ও পরে একটি ড্রোন
ভূপাতিত করেছে।
ইরান-সমর্থিত হুথিরা অভিযোগ করেছে, যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র সৌদি আরব শুক্রবার
ইয়েমেনে তাদের অবস্থানে হামলা চালিয়ে ‘বিপজ্জনক উত্তেজনা’ সৃষ্টি করেছে।
ইয়েমেনের
এক নিরাপত্তা সূত্র এএফপিকে জানিয়েছে, সৌদি হামলায় হোদেইদা
বন্দরের একটি নৌঘাঁটি ও
কামারান দ্বীপের একটি সামরিক স্থাপনা
লক্ষ্যবস্তু হয়েছিল।
ফেব্রুয়ারির
শেষ দিকে ইরানের ওপর
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলার
পর মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতে নতুন একটি যুদ্ধক্ষেত্র
হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মিত্রদের
মধ্যে এই পাল্টাপাল্টি হামলা
দেখা দিয়েছে।
হোদেইদার
বাসিন্দা ৩৬ বছর বয়সী
দুই সন্তানের মা ফায়জা এএফপিকে
বলেন, হামলার শব্দ ছিল ‘প্রচণ্ড
বজ্রপাতের মতো’।
তিনি
তিনটি পৃথক বিস্ফোরণের শব্দ
শুনেছেন।
জায়জা
আরও বলেন, ‘আমি বিশ্বাস করতে
চাইনি যে আমরা আবারও
হামলার সেই দিনগুলোতে ফিরে
গেছি।’
২০১৫
সাল থেকে ইয়েমেনের হুথিদের
সঙ্গে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ও সৌদি-সমর্থিত
সরকারের যুদ্ধ চলছে। দীর্ঘ এই সংঘাতে কয়েক
লাখ মানুষ নিহত হয়েছে এবং
দেশটিতে ভয়াবহ মানবিক সংকট তৈরি হয়েছে।
তবে
২০২২ সালে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায়
হওয়া যুদ্ধবিরতির পর দরিদ্র এই
দেশটিতে বড় ধরনের সংঘর্ষ
অনেকটাই থেমে ছিল।
চলতি
সপ্তাহে হুথিরা বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তেল রপ্তানিকারক
দেশ সৌদি আরবের বিরুদ্ধে
সামুদ্রিক অবরোধের ঘোষণা দেয় এবং লোহিত
সাগরে সৌদি জাহাজ লক্ষ্য
করে হামলা চালায়।
ইরানের
পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি বলেন, এই পরিস্থিতির জন্য
তেহরানকে দায়ী করা যায়
না।
তিনি
হুথি ও সৌদিদের মধ্যে
আলোচনার উদ্যোগ নিতে ইরানের সহায়তার
প্রস্তাব দেন।
আরাকচি
আরও বলেন, ‘এই সমস্যার কোনো
সামরিক সমাধান নেই।’
এই নৌ-হুমকির পাশাপাশি
ইরান হরমুজ প্রণালী অবরোধের পদক্ষেপ নিয়েছে, যা বর্তমানে তেহরান
ও ওয়াশিংটনের মধ্যে উত্তেজনার প্রধান কেন্দ্র হয়ে উঠেছে।
ইরানের
বিপ্লবী গার্ড বাহিনী শনিবার জানায়, গত ২৪ ঘণ্টায়
কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ দিয়ে
যাওয়ার চেষ্টা করা চারটি জাহাজ
তারা আটকে দিয়েছে।
এদিকে
যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস পর্যবেক্ষণ সংস্থা জানিয়েছে, শনিবার হরমুজ প্রণালীর কাছে একটি ট্যাংকার
জাহাজ ও অজ্ঞাত সামরিক
বাহিনীর মধ্যে নতুন একটি ঘটনার
খবর পাওয়া গেছে।
যুক্তরাষ্ট্র
শনিবার ইরানের বিরুদ্ধে নতুন কোনো হামলার
ঘোষণা দেয়নি। দুই পক্ষের টানা
১৩ রাতের বোমা হামলার পর
এটিই ছিল প্রথম বিরতি।
সংবাদমাধ্যম
অ্যাক্সিওসের এক প্রতিবেদনে বলা
হয়, পেন্টাগন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে ইরানের বিরুদ্ধে
১৪তম রাতের হামলার পরিকল্পনা উপস্থাপন করেছিল। তবে ট্রাম্প তা
অনুমোদন না করে নতুন
করে আলোচনার পথ বেছে নিয়েছেন।
শুক্রবার
ট্রাম্প বলেন, ইরানের বিরুদ্ধে আবার বড় ধরনের
সামরিক অভিযান শুরু করবেন কি
না, সে বিষয়ে তিনি
এখনো সিদ্ধান্ত নেননি।
সাংবাদিকদের
তিনি বলেন, ‘আমরা এখন তাদের
সঙ্গে কথা বলছি। আমি
মনে করি দিন যত
যাচ্ছে, তারা আরও বেশি
গুরুত্বের সঙ্গে বিষয়টি দেখছে এবং সম্ভবত এর
কারণ স্পষ্ট।’
ট্রাম্প
বলেন, ইরানের সামনে দুটি পথ রয়েছে-একটি হলো চুক্তিতে
পৌঁছানো, অন্যটি হলো আরও ‘বড়
মাত্রার’ হামলার মুখোমুখি হওয়া। এর আগে দুই
সপ্তাহের মার্কিন হামলায় এপ্রিলের যুদ্ধবিরতি ভেঙে পড়ে।
এক সময় ট্রাম্প যে
যুদ্ধকে চার-পাঁচ সপ্তাহের
মধ্যে শেষ হবে বলে
ধারণা করেছিলেন, তা এখন পঞ্চম
মাসের দিকে এগোচ্ছে। এই
দীর্ঘ সংঘাত আগামী নভেম্বরের গুরুত্বপূর্ণ মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে তার জনপ্রিয়তার
ওপরও প্রভাব ফেলছে।
এএফপি