ক্ষয়িষ্ণু যুদ্ধবিমান বহরের ঘাটতি পূরণ করতে গিয়ে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ প্রতিরক্ষা ব্যয়কারী দেশটি বাতিল তথা পরিষেবা থেকে বাদ দেওয়া বিমানের যন্ত্রাংশ সংগ্রহ করতে বাধ্য হয়েছে।
সম্প্রতি
নয়াদিল্লি ব্রিটিশ-নির্মিত নয়টি জাগুয়ার গ্রাউন্ড-অ্যাটাক জেট সংগ্রহ করেছে,
যেগুলো ভারতীয় বিমানবাহিনীতে (আইএএফ) যুক্ত হবে না। বরং
এগুলো থেকে সংগ্রহ করা খুচরা যন্ত্রাংশ প্রায়
১২০টি বিমান নিয়ে গঠিত ছয়টি সক্রিয়
জাগুয়ার স্ট্রাইক স্কোয়াড্রনকে টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করা হবে।
বিশ্লেষকরা
বলেছেন, এই উদ্যোগ সাময়িক সমাধান হলেও এটি ভারতের
বিমান শক্তির একটি গভীরতর দুর্বলতাও
উন্মোচন করেছে: বিদেশি যন্ত্রাংশের উপর নির্ভরতা এবং
যথেষ্ট দ্রুততার সাথে প্রতিস্থাপনযোগ্য বিমান
অন্তর্ভুক্ত করতে না পারার
কারণে ভারতীয় বিমান বাহিনী (আইএএফ) সরকার-অনুমোদিত বহরের আকারের চেয়ে অনেক কম বিমান
নিয়ে কাজ করছে।
বর্তমানে দেশটির
অনুমোদিত ৪২টি স্কোয়াড্রনের বিপরীতে মাত্র ২৯টি ফাইটার স্কোয়াড্রন
রয়েছে। এগুলো দিয়ে চীন ও পাকিস্তানের
সঙ্গে সম্ভাব্য দ্বি-মুখী পরিস্থিতির মোকাবেলায় প্রয়োজনীয় শক্তি স্তর থেকে প্রায়
এক-তৃতীয়াংশ কম।
ভারতের
সাবেক এয়ার ভাইস-মার্শাল কপিল
কাক দেশের বিমান বহরের এই দুর্বলতার জন্য ধীর দেশীয় উৎপাদন,
দক্ষ জনবলের অভাব এবং চুক্তি
ও বাধ্যবাধকতা পূরণে দায়বদ্ধতার অভাবকে দায়ী করেছেন।
ভারত
তেজাস এমকে১, তেজাস এমকে২ এবং অ্যাডভান্সড মিডিয়াম
কমব্যাট এয়ারক্রাফট (এএমসিএ) -এর জন্য জিই
এফ৪০৪ এবং এফ৪১৪ ইঞ্জিনসহ
গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশের জন্যও বিদেশি সরবরাহকারীদের উপর নির্ভরশীল ছিল।
এসব যন্ত্রাংশ পেতে প্রায়শই
বিলম্ব হতো বা সরবরাহ
পাওয়া যেত না বলে
কাক উল্লেখ করেছেন।
স্টকহোম
ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের
সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুসারে, ২০২৫ সালে মার্কিন
যুক্তরাষ্ট্র, চীন, রাশিয়া এবং
জার্মানির পর ভারত ছিল
বিশ্বের পঞ্চম বৃহত্তম সামরিক ব্যয়কারী দেশ।
২০২৬-২৭ অর্থবর্ষের জন্য
ভারতের বাজেটের প্রায় ১৪.৬৭ শতাংশ
বা ৮২ বিলিয়ন মার্কিন
ডলার প্রতিরক্ষা খাতে বরাদ্দ করা
হয়েছে, যা সমস্ত মন্ত্রণালয়ের
মধ্যে সর্বোচ্চ।
কিন্তু
কাক এই কথার সঙ্গে
দ্বিমত পোষণ করেছেন যে
ভারত প্রতিরক্ষা খাতে বিপুল ব্যয়
করে।
তিনি
বলেন, “প্রতিরক্ষা খাতে ভারতের ৮২
বিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয় দেশের
জিডিপির মাত্র ২ শতাংশ। সুতরাং,
ভারত তার আকার, সম্ভাবনা
এবং যে সমস্ত চ্যালেঞ্জের
মুখোমুখি হয়, তা বিবেচনা
করলে মোটেই উচ্চ ব্যয়কারী দেশ
নয়। প্রকৃতপক্ষে, প্রতিরক্ষা খাতে এটি একটি
খুবই পরিমিত ব্যয়কারী দেশ।”
তবে,
এই ঘাটতি চীন ও পাকিস্তান
উভয়কে জড়িত একটি সম্ভাব্য সংঘাতের
জন্য ভারতের প্রস্তুতিকে প্রভাবিত করতে পারে বলে
কাক সতর্ক করেন।
“আমাদের
চ্যালেঞ্জ পাকিস্তান নয়, বরং চীন।
এটি দুই রণাঙ্গনের যুদ্ধ
না হলেও, দুটি দেশের সঙ্গে
এটি এক রণাঙ্গনের যুদ্ধ,”
তিনি বলেন। তিনি গত বছরের
ভারত-পাকিস্তান সংঘাতের কথা উল্লেখ করেন,
যে সময় বেইজিং ইসলামাবাদকে
ঘটনাস্থলে কারিগরি সহায়তা দিয়েছিল বলে তিনি জানান।
ভারত
তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তানের চেয়ে প্রতিরক্ষায় প্রায় আট গুণ বেশি
ব্যয় করে। পাকিস্তানের মোট
প্রতিরক্ষা বরাদ্দ প্রায় ১১ বিলিয়ন মার্কিন
ডলার, যেখানে চীনের আনুমানিক প্রতিরক্ষা বাজেট ২৬০ বিলিয়ন মার্কিন
ডলার।
সাম্প্রতিক
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ভারতের
প্রতিরক্ষা বাজেটের প্রায় ৭০ শতাংশ বেতন,
পেনশন এবং পরিচালন ব্যয়ে
যায়, বাকিটা মূলধন সংগ্রহ এবং আধুনিকীকরণের জন্য
বরাদ্দ থাকে।
তবে,
কাক ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী। তিনি এএমসিএ-এর
জন্য একটি ১২০ কিলোনিউটন
ইঞ্জিন যৌথভাবে তৈরির লক্ষ্যে ভারত-ফ্রান্স অংশীদারিত্বের
মতো উদ্যোগগুলোকে দেশের ২০৪৭ প্রতিরক্ষা পরিকল্পনার
দিকে ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করেন। এই পরিকল্পনায় যৌথ
অভিযান, দেশীয় মহাকাশযান নির্মাণ এবং উদীয়মান যুদ্ধক্ষেত্রগুলোকে
ভারতীয় বিমান বাহিনীতে (আইএএফ) অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টিকে অগ্রাধিকার
দেওয়া হয়েছে।
“১১৪টি
রাফাল যুদ্ধবিমান সংগ্রহের ফলে আমাদের বিমানবহর
আরও শক্তিশালী হবে, যার মধ্যে
৯৬টি ভারতেই তৈরি করার পরিকল্পনা
রয়েছে,” কাক বলেন। তিনি
আরও উল্লেখ করেন যে, বর্তমান
বিমানবহর রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বাতিল হওয়া
বিমান থেকে যন্ত্রাংশ কেনা
একটি সাধারণ প্রথা।
বাতিল
হওয়া জাগুয়ারের ওপর ভারতের নির্ভরতা
নতুন নয়। ১৯৮০-এর
দশকে এই বিমান অন্তর্ভুক্ত
করার পর, দিল্লি ২০১৮
সালে ৩১টি বাতিল ফরাসি
জাগুয়ার পায় এবং এই
বছরের শুরুতে ওমানের সঙ্গে আরও ২০টিরও বেশি
বাতিল বিমানের জন্য একটি চুক্তি
স্বাক্ষর করে, যা মূলত
যন্ত্রাংশ হিসেবে ব্যবহৃত হবে।
ভারতের
সাবেক নৌ কর্মকর্তা এবং
সোসাইটি ফর পলিসি স্টাডিজ
থিঙ্ক ট্যাঙ্কের পরিচালক সি. উদয় ভাস্কর
বলেছেন, একটি বৃহত্তর প্রতিরক্ষা
বাজেট “স্বয়ংক্রিয়ভাবে দ্রুত নতুন অত্যাধুনিক আকাশযান
সরবরাহ করে না”।
ভাস্কর
বলেন, “জটিল ক্রয় পদ্ধতির
কারণে বিলম্ব ঘটে এবং দেশীয়
উৎপাদনের ধীর গতি এখন
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বিমানের ইঞ্জিন সরবরাহের প্রতিবন্ধকতার কারণে আরও বেড়েছে।”
মার্কিন
প্রতিরক্ষা সংস্থা জেনারেল ইলেকট্রিকের সঙ্গে এফ৪১৪ যুদ্ধবিমানের ইঞ্জিন নিয়ে ভারতের আলোচনা বাধাগ্রস্ত হয়েছে, কারণ এর দাম
বেড়ে যাওয়ায় ভারতের এএমসিএ কর্মসূচি নিয়ে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে।
ভাস্কর
বলেন, যুদ্ধবিমানের দামের এই তীব্র বৃদ্ধি
ভারতের যুদ্ধবিমান সংগ্রহের ক্ষেত্রে আরেকটি সীমাবদ্ধতা।
“১৯৯৬
সালে কেনা এসইউ-৩০
[সুখোই] বিমানের দাম ছিল প্রতিটি
প্রায় ৩০ মিলিয়ন মার্কিন
ডলার। ২০১৬ সালে রাফালের
দাম ছিল প্রায় ১০০
মিলিয়ন মার্কিন ডলার। এছাড়াও, ডলারের তুলনায় রুপির ক্রমাগত অবমূল্যায়ন হয়েছে – যার ফলে বৈদেশিক
মুদ্রায় প্রকৃত ক্রয় ক্ষমতা কমে গেছে।”
ভাস্কর
সতর্ক করে বলেন যে,
যুদ্ধবিমানের এই ঘাটতি ভারতের
সামগ্রিক আকাশ শক্তিকে নেতিবাচকভাবে
প্রভাবিত করবে।
“দুই
রণাঙ্গনে [চীন ও পাকিস্তান]
সংঘাত খুবই কঠিন হবে
যদি আকাশ শক্তি হ্রাস
পায়। বর্তমান ক্রয় এবং দেশীয় উৎপাদন
কাঙ্ক্ষিত স্তরের নিচে রয়েছে,” তিনি
বলেন।
পাকিস্তান
আরও চেংডু জে-১০সি যুদ্ধবিমান
অধিগ্রহণ এবং বেইজিং ও
ইসলামাবাদের যৌথ উৎপাদিত জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমানের ব্যাপক
আধুনিকীকরণের মাধ্যমে তাদের বিমানবাহিনীকে উন্নত করার পরিকল্পনা করছে।
এই দুই মিত্র দেশ
পঞ্চম প্রজন্মের শেনিয়াং জে-৩৫ স্টেলথ
যুদ্ধবিমান কেনার জন্য একটি “প্রাথমিক
সহযোগিতামূলক চুক্তি”-তেও স্বাক্ষর করেছে।
ইউনিভার্সিটি
অ্যাট আলবানির সহযোগী অধ্যাপক এবং ওয়াশিংটনের স্টিমসন
সেন্টার থিঙ্ক ট্যাঙ্কের অনাবাসিক ফেলো ক্রিস্টোফার ক্লে
ভারতের বিমানবাহিনীকে ছোট আকারের বলে
বর্ণনা করেছেন।
তিনি
বলেন, “চীন ও পাকিস্তানের
যুগপৎ হুমকি মোকাবেলার জন্য এই বাহিনী
খুবই ছোট এবং অনেক
ক্ষেত্রে খুবই পুরোনো।”
“বিদেশি
বিমানের কাঠামো যৌথভাবে উৎপাদন এবং দেশীয়ভাবে বিমান
সংগ্রহের বৃহত্তর অংশের প্রতি ভারতের আকাঙ্ক্ষার কারণে প্রায়শই ভারতীয় বিমানবাহিনীতে নতুন বিমান অন্তর্ভুক্তিতে
দীর্ঘ বিলম্ব হয়েছে।”
তিনি
ব্রিটিশ জাগুয়ার, ফরাসি রাফাল এবং রুশ মিগের
মতো বিভিন্ন ধরনের বিমান ভারতের সংগ্রহকে স্বাগত জানিয়ে বলেছেন যে, এই বৈচিত্র্যময়
বিমানবহর দেশকে কোনো একটি সরবরাহকারীর
চাপ থেকে রক্ষা করে,
কিন্তু সতর্ক করে দিয়ে বলেন
যে, “এটি [একই সাথে]
সংগ্রহ ও রক্ষণাবেক্ষণের ক্ষেত্রেও
জটিলতা তৈরি করে”।
সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট থেকে অনুবাদ