ভারতীয় আধিপত্যবাদের বলয় থেকে দেশকে বের করে আনতে মরহুম প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান প্রথম বিদেশ সফর করেছিলেন চীনে, ১৯৭৭ সালের জানুয়ারিতে। দ্বিতীয় সফরটি ছিল ইরানে, একই বছর মার্চে। যদিও তখন তিনি প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের দায়িত্ব পালন করছিলেন। ২১ এপ্রিল তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। অবশ্য এর আগের বছর কলম্বোতে তিনি জোট নিরপেক্ষা আন্দোলনের শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দেন। তবে সেটা রাষ্ট্রীয় সফর ছিল না।
পিতার পদাঙ্ক অনুসরণ এবং আঞ্চলিক আধিপত্যবাদীদের উপেক্ষা করে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার প্রথম বিদেশ সফরে ২১ জুন মালয়েশিয়া যাচ্ছেন। যদিও ভারত, চীন ছাড়াও আরো কয়েকটি দেশ থেকে তারেক রহমানকে সফরের আমন্ত্রণ জানানো হয়।
কূটনীতিতে, কোনো নেতার প্রথম বিদেশ সফরকে তার পররাষ্ট্রনীতির অগ্রাধিকারের সংকেত হিসেবে দেখা হয়। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই তার প্রথম বিদেশ সফর নিয়ে বেশ কৌতুহল ছিল। ভারত না চীন – এমন আলোচনাও ছিল। কারণ, তারেক রহমানকে প্রথম সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি।
মালয়েশিয়া সফরের কূটনৈতিক তাৎপর্য
ভারত ও চীনের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা: ভারত বা চীনের পরিবর্তে মালয়েশিয়াকে বেছে নেওয়ার মাধ্যমে ঢাকা কোন বৃহৎ শক্তির পক্ষ নিচ্ছে – এমন ধারণা এড়িয়ে গেছে। একে কূটনৈতিক নমনীয়তা এবং কৌশলগত নিরপেক্ষতা বজায় রাখার প্রচেষ্টা হিসেবে বিবেচনা করা যায়।
স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি: এই সিদ্ধান্ত সরকারের ‘বাংলাদেশ-প্রথম’ নীতি তুলে ধরার ইচ্ছাকে আরও শক্তিশালী করে, যা আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার দৃষ্টিকোণ থেকে না দেখে জাতীয় স্বার্থের ওপর জোর দেয়। কোন তৃতীয় দেশকে গন্তব্য হিসেবে বেছে নেওয়ার মধ্য দিয়ে সরকার তার নিজস্ব শর্তে বৈদেশিক সম্পর্ক পুননির্মাণ করতে পারবে।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার: শ্রম অভিবাসন, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, শিক্ষা এবং জ্বালানি সহযোগিতার ক্ষেত্রে মালয়েশিয়া বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। লাখ লাখ বাংলাদেশী শ্রমিকের মালয়েশিয়ার সঙ্গে কর্মসংস্থানের সংযোগ রয়েছে। ফলে এই সম্পর্কের অর্থনৈতিক তাৎপর্য গভীর।
দ্বিতীয় সফরের তারেক রহমান চীন যেতে পারেন। প্রথমে মালয়েশিয়া সফর করার কারণে বেইজিংয়ের সঙ্গে ঢাকার পরবর্তী সম্পৃক্ততাগুলো ভূ-রাজনৈতিকভাবে (ভারতের সঙ্গে) ততটা উত্তপ্ত মনে হবে না।
প্রথম গন্তব্য হিসেবে মালয়েশিয়াকে বেছে নেয়া থেকে যে বার্তা পাওয়া যায়: বাংলাদেশ ভারত ও চীন উভয়ের সঙ্গেই কার্যকরী সম্পর্ক বজায় রাখতে আগ্রহী; দেশটি একটি বহুমুখী পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করবে; অর্থনৈতিক কূটনীতি এবং শ্রমবাজারের সুযোগ শক্তিশালী করা হবে; দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে সম্পৃক্ততা বাড়বে এবং বৃহৎ শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতায় খুব বেশি জড়াবে না।
কূটনৈতিক ভারসাম্য, কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন এবং অর্থনৈতিক বাস্তববাদ প্রদর্শনের জন্যই বাংলাদেশের সরকার প্রধান মালয়েশিয়াকে বিদেশ সফরের প্রথম গন্তব্য হিসেবে বেছে নিয়েছেন বরে মনে হচ্ছে।