আজ ২৩ জুন আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। দলটি ৭৭ বছর পেরিয়ে ৭৮ বছরে পা রাখল। পাকিস্তান আমলে সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে সংগ্রাম, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার ঐতিহ্যের ধারক আওয়ামী লীগ এখন রীতিমতো বার্ধক্যে উপনীত হয়েছে। বয়স বাড়লেই যে সব ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতা বাড়ে না, তা মানুষের ক্ষেত্রে যেমন সত্য, মানুষের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অনেক কিছুর ক্ষেত্রেও সত্য। মানুষের বয়স বৃদ্ধি পেলে অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাঁদের স্মৃতিভ্রম ঘটে, বার্ধক্যজনিত রোগব্যাধি তো আছেই, ভীমরতিতেও ধরে। অধিক বয়স পরিপক্বতা আনে খুব কমসংখ্যক বৃদ্ধের মধ্যে। বৃদ্ধ ব্যক্তিরা অতীতের জাবর কাটার মধ্যে সুখ খোঁজেন। যেখানে তাঁদের সামান্য ও তুচ্ছ ভূমিকা ছিল অথবা আদৌ ছিল না, সেগুলোকে ফুলিয়েফাঁপিয়ে বলেন। কোথাও তাঁদের নিন্দনীয় ভূমিকা থাকলে তা বেমালুম চেপে যাওয়ার চেষ্টা করেন।
বাংলাদেশে মানবসৃষ্ট দুটি রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও জামায়াতে ইসলামীর বেলায়ও তাদের বয়সজনিত সমস্যাগুলোর সম্পর্ক প্রবল। দুটি দলই প্রাচীন। আওয়ামী লীগ যখন ৭৮ এ পড়ল, তখন জামায়াতের বয়স ৮৫ বছর। দল দুটির মধ্যে অনেক মিল এবং অনেক অমিল আছে। ইতিহাসের মোড়ে মোড়ে তাদের অস্বস্তিকর প্রেম হয়েছে-১৯৬৫ সালে আইউব খানের বিরুদ্ধে প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হিসেবে ফাতিমা জিন্নাহকে সমর্থন জানানোর ক্ষেত্রে, ১৯৮৬ সালে এরশাদের অধীনে নির্বাচনে যাওয়ার জন্য দল দুটির গোপন আঁতাতে উপনীত হতে এবং ১৯৯৬ সালে বিএনপিকে পরাজিত করে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় আনার ক্ষেত্রে।
আওয়ামী লীগ-জামায়াত প্রেম যেমন চকিতে হয়েছে, তেমন দ্রুততায় তাদের প্রেমের বন্ধন টুটেও গেছে। আরও মিল আছে এই দল দুটির — জামায়াত ‘একাত্তরে’ তাদের ভূমিকা যথাসম্ভব আড়াল করে, আওয়ামী লীগ ১৯৭৫ সালের ‘বাকশাল-কাণ্ড’ চেপে যায়। শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগ নেতারা সর্বক্ষণ শেখ মুজিবের প্রতিটি ‘স্বপ্ন’ বাস্তবায়নে বদ্ধপরিকর বলে মুখ ফেনায়িত করলেও ১৯৯৬-২০০১ এবং ২০০৯-২০২৪ মেয়াদে শেখ হাসিনা একটি বারের জন্যও তাঁর পিতার মহান উদ্যোগ ‘দ্বিতীয় বিপ্লব’ খ্যাত ‘বাকশাল’ পুনঃপ্রতিষ্ঠার আকাংখা ব্যক্ত করেননি।
২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ কি করেছিল, তা সবার জানা এবং কেউ তাদের অপরাধকে ক্ষমার চোখে দেখেনি, তার প্রমাণ ছিল ২০২৪ এর জুলাই-আগস্ট। ১৯৭০ সালে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদ নির্বাচনেও তারা একই কাজ করেছিল। কিন্তু আওয়ামী লীগ তখন মাত্র ২১ বছর বয়সী তরুণ একটি দল। এই বয়সে অনেকে রক্তের গরমে অনেক গুরুতর ভুল করে বসে। ১৯৭০ এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ভুলকে দেশবাসী বয়সজনিত ভুল বলে মেনে নিয়েছিল।
এরপর অনেক সময় পার হয়েছে। এই দীর্ঘ সময়ে বাংলাদেশে কত দলের জন্ম হয়েছে, কত দলে ভাঙচুর হয়েছে এবং অস্তিত্বহীন হয়েছে, তা নিষ্ঠাবান রাষ্ট্রবিজ্ঞানিদের গবেষণার চমৎকার বিষয় হতে পারে। ১৯০৬ সালে ঢাকায় প্রতিষ্ঠিত মুসলিম লীগ পাকিস্তানের স্বাধীনতা অর্জনে একক ভূমিকা রেখেছিল। দলটি অখন্ড পাকিস্তান এবং পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চল পূর্ব পাকিস্তানেও শাসন পরিচালনা করেছে। মুসলিম লীগ ভাঙতে ভাঙতে শেষ পর্যন্ত ইতিহাসের পাতা ছাড়া বাংলাদেশের আর কোথাও অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে পারেনি। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে আওয়ামী মুসলিম লীগ, কৃষক শ্রমিক পার্টি, নেজাম-এ-ইসলাম, গণতন্ত্রী দল, খিলাফত-ই-রাব্বানি পার্টি সমন্বয়ে গঠিত ‘যুক্তফ্রন্ট’ পূর্ব পাকিস্তানে প্রাদেশিক সরকার গঠন করেছিল। ‘মুসলিম’ বর্জিত আওয়ামী লীগ ছাড়া একসময়ে ক্ষমতার অংশীদার দলগুলোর নাম বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসপড়ুয়ারা ছাড়া কেউ জানে না। ভেঙেছে জামায়াতে ইসলামীর মতো ক্যাডারভিত্তিক সংগঠনও – একবার মাওলানা আবদুর রহীমের নেতৃত্বে বড় আকারে, আরেকবার মাওলানা আবদুল জব্বারের নেতৃত্বে ছোট আকারে। জামায়াতের সেই দুই ভগ্নাংশ এখন আর অস্তিত্বে নেই।
আশির দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত বেইজিংপন্থি প্রত্যেক বাম নেতার এক একটি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দল ও উপদল ছিল। এখন একটিরও অস্তিত্ব নেই। দাপটের সঙ্গে ক্ষমতায় থাকা ও জাতীয় সংসদে কয়েক দফা বিরোধী দলে থাকা এরশাদের জাতীয় পার্টি তিন-চার খণ্ডে বিভক্ত হয়ে এখন প্রতিটি খণ্ড নিভু নিভু অবস্থার মধ্যে আছে। ১৯৭৫ সালের জানুয়ারি মাসে আওয়ামী লীগ সংবিধান সংশোধন করে নিজেরাই নিজেদের দলকে বিলুপ্ত করে বাকশাল প্রতিষ্ঠা করেছিল। কিন্তু আওয়ামী লীগ তাদের সাধের ফসল বাকশাল-এর ওপর ‘তাওয়াক্কুল’ বা আস্থা রাখতে পারেনি। যে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান আওয়ামী নেতাদের চোখের বিষ, তাঁরা সেই সামরিক শাসকের ঘোষিত ‘পলিটিক্যাল পার্টিজ রেগুলেশন অ্যাক্ট’ (পিপিআর) বা ‘রাজনৈতিক দলবিধি’র নিয়মকানুন মেনে চলার কসম কেটে নতুন করে ‘আওয়ামী লীগ’ বাংলাদেশের রাজনীতিতে কদম রাখার অনুমতি পেয়েছে। জীবজগতে কোনো জীবের মৃত্যু হলে তাদের বয়স যেমন সেখানেই থেমে যায়, অনুরূপ কোনো দল নিজের মৃত্যু নিশ্চিত করার পর ১৯৭৫ সালেই দলটির অস্তিত্বের বিনাশ ঘটেছিল কিনা, তা নির্ণয় করার জন্য গবেষণার প্রয়োজন নেই।
বর্তমান আওয়ামী লীগের বয়স গণনা করতে যুক্তির খাতিরে হলেও ১৯৭৬ সাল থেকে গণনা করাই সংগত, যখন দলটির নেতারা তাদের দ্বারা বিলুপ্ত প্রাণপ্রিয় দলকে বাংলাদেশে রাজনীতি করার সুযোগ দেওয়ার আবেদন করেছিলেন। ভাগ্যের কী বিড়ম্বনা! যে দল পাকিস্তানের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে দীর্ঘ সময় লড়াই করেছে, মাত্র ছয় বছর আগে যে দলের নেতাদের নেতৃত্বে দেশ স্বাধীনতা লাভ করেছে এবং স্বাধীনতা অর্জিত হওয়ামাত্র যে দলের নেতারা দেশের মা-বাপ এবং অসহায় জনগণের দণ্ডমুণ্ডের বিধাতা হয়ে উঠেছিলেন, তাঁরাই সামরিক সরকারের কাছে নিবেদন করেছেন রাজনীতি করার ‘একটুখানি সুযোগ’ দিতে। সামরিক সরকার তাঁদের রাজনীতি করার ‘সদয়’ অনুমতি দান করে এবং অনুমোদন লাভের পর মিজানুর রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বে দলটির আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়। নতুন কোনো সংগঠনের সূচনা আহ্বায়ক কমিটির হাত ধরেই ঘটে। তবে ‘দল’ যেহেতু একটি ‘ধারণা’ বা ‘আদর্শ,’ অতএব এর পুনর্জন্মের সুযোগ রয়েছে। সে হিসেবে আওয়ামী লীগ যদি তাদের ১৯৪৯ সালের প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে মাঝের বিরতিসহ বয়স হিসাব করে, তাহলে তা দোষণীয় হবে না।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের মনস্তাত্ত্বিক শাখায় মানুষের ‘নিয়ার ডেথ এক্সপেরিয়েন্স’ (এনডিই) বা মৃত্যুর কাছাকাছি পৌঁছেও আবার বেঁচে ওঠার মতো ১৯৭৬ সালে আওয়ামী লীগের পুনরায় রাজনীতিতে ফিরে আসার মতো দৃষ্টান্ত বিশ্বে আরও রয়েছে। রাজনৈতিক দলের এ ধরনের প্রত্যাবর্তনকে রাজনৈতিক মনোবিজ্ঞানে ‘আইডেনটিটি বেজড পোলারাইজেশন’ (পরিচয়ভিত্তিক মেরুকরণ) বলে বর্ণনা করা হয়েছে; অর্থাৎ এই ফিরে আসার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দলের নীতির কঠোর অনুসরণের কোনো সম্পর্কের চেয়ে দেশে দৃশ্যত রাজনৈতিক শূন্যতার সুযোগে পুরোনো সমর্থকদের আবেগকে কাজে লাগিয়ে রাজনৈতিক ময়দানে নিকট ভবিষ্যতে দাপুটে অবস্থান সৃষ্টি করার প্রত্যাশাই অধিক থাকে। আওয়ামী লীগের পুনরাবির্ভাবের পেছনেও তাদের নীতির ওপর অটল থাকার বালাই ছিল না। তবু স্বাধীন বাংলাদেশে আওয়ামী লীগকে দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় যেতে দীর্ঘ ২১ বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে। আওয়ামী লীগের পক্ষে তা-ও সম্ভব হতো না, যদি ১৯৯৬ সালের নির্বাচনের আগে জামায়াতে ইসলামী বিএনপির ওপর নানা কারণে গোস্সা হয়ে তাদের কোল থেকে নেমে না পড়ত।
যা হোক আওয়ামী লীগের বাকশাল-পরবর্তী এবং জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বাধীন সামরিক সরকারের বদান্যতাসমৃদ্ধ পুনরাবির্ভূত আওয়ামী লীগের ভাঙন দীর্ঘস্থায়ী ছিল না। মস্কোপন্থি মহিউদ্দিন আহমদ এবং ভারতপন্থি আবদুর রাজ্জাকের নেতৃত্বে যে অংশটি বাকশাল-এর ওপরই আস্থাশীল ছিলেন, একপর্যায়ে তাঁরা উপলব্ধি করেন যে শেখ মুজিবের নেতৃত্বে ক্ষমতার আসনে থেকে এক নেতার এক দল বাকশালের যে ফায়দা ছিল, ক্ষমতাহীন অবস্থায় কেবল বাকশাল সাইনবোর্ড টাঙিয়ে রাজনীতিতে সুবিধা করা যাবে না। অতএব কয়েক বছর পর তাঁরা বাকশালের ওপর আস্থা হারিয়ে আওয়ামী লীগে যোগ দেন। সামরিক সরকারের অনুমোদন লাভের পর আওয়ামী লীগ যখন মাঠের রাজনীতিতে অবতীর্ণ হয়, তখন দলটিতে শুরু হয় নেতৃত্বের কোন্দল। এই কোন্দলে আওয়ামী লীগ বিভক্ত হয়ে বৃহৎ অংশ আবদুল মালেক উকিলের নেতৃত্বে এবং ক্ষুদ্র অংশ মিজানুর রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বে পরিচালিত হতে থাকে।
মানুষের মন বড় বিচিত্র। অল্প সময়ের ব্যবধানে আওয়ামী লীগের একসময়ের জাঁদরেল নেতা ও সাবেক মন্ত্রী মিজানুর রহমান চৌধুরী আরেক সামরিক সরকারের প্রধান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রিত্বের প্রস্তাব পেয়ে তা লুফে নেন এবং তাঁর অংশের আওয়ামী লীগকে দাফন করে এরশাদের জাতীয় পার্টিতে যোগ দিয়ে মোটামুটি ১ বছর ৯ মাস বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সম্মানজনক ও লাভজনক আসন অলংকৃত করেন। মিজানুর রহমান চৌধুরী তাঁর ভাগে পড়া খণ্ডিত আওয়ামী লীগকে দাফন করে অন্যায় কিছু করেননি। তিনি এটা না করে যদি শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগে বিলীন হতেন তাহলে কি তাঁর পক্ষে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হওয়া সম্ভব হতো? কস্মিনকালেও না! ক্ষমতার রাজনীতিতে পদ অতি গুরুত্বপূর্ণ, তা প্রকৃত ক্ষমতার অধিকারী পদ হোক, অথবা তাসের রাজার মতো আলংকারিক পদ হোক। এরশাদ ক্ষমতা দখল করার দুই বছর পর ১৯৮৪ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত সাত বছরে তিনি চারজনকে প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত করেছিলেন। একেক জনের মেয়াদকাল বেশি ছিল না। তারা যত স্বল্পসময় ও যত ক্ষমতাহীন হয়ে থাকুন কেন, ইরেজার দিয়ে ঘষাঘষি করেও তারা যে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন তা ইতিহাসের পাতা থেকে মুছে ফেলা যাবে না। রাজনীতিবিদদের ৯৯.৯ শতাংশই তো পদের আশায়ই রাজনীতি করেন। শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ যতবার সরকার গঠন করেছে, ততবার তিনিই প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। দলে যদি তাঁর চেয়ে যোগ্য নেতার অস্তিত্ব থেকেও থাকে, তাহলেও তাঁর জীবদ্দশায় এই পদ যে দলের অন্য কারও ভাগ্যে নেই, তা স্বতঃসিদ্ধ ছিল।
রাজনৈতিক দলের ‘ন্যাচারাল ডেথ’ বা স্বাভাবিক মৃত্যু এক বিষয়, আর সংবিধান সংশোধন করে, নতুন আইন সৃষ্টি করে ঐতিহ্যের দাবিদার, অর্জনে-অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ একটি দলকে মেরে ফেলা হত্যার মতো গুরুতর অপরাধে দোষী সাব্যস্তকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করার শামিল। এ কাজটিই করেছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি শুধু তাঁর দলকে হত্যা করেননি, দেশের ছোটবড় সব রাজনৈতিক দলকে কবরস্থ করেছিলেন। সংবাদপত্রের প্রকাশনা নিষিদ্ধ করেছিলেন। আওয়ামী লীগ যা বিশ্বাস করে বলে তাদের দলের গঠনতন্ত্রে মুদ্রিত ছিল বা এখনো আছে, তারা যদি সেগুলো সত্যিই বিশ্বাস করত, তাহলে একদলীয়, এক ব্যক্তিকেন্দ্রিক ‘বাকশালী’ শাসন প্রতিষ্ঠা করতে পারত না।
আওয়ামী লীগ নেতারা মুখে গণতন্ত্রের কথা বলেন, দলটির গঠনতন্ত্রের ছত্রে ছত্রে ‘সংসদীয় গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপদান, জনগণের পছন্দমতো ভোটাধিকার প্রয়োগের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, ধর্মনিরপেক্ষতা ও ধর্মীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, জনগণের ঐক্য ও সংহতির বিধান’ করার মতো সুন্দর সুন্দর কথামালা রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে এসব কথা বলে জনগণকে প্রলুব্ধ করে এবং ভোটের অধিকার হরণ করে কীভাবে ক্ষমতায় জেঁকে বসতে হয়, সে কৌশল আওয়ামী লীগ ছাড়া আর কোনো দলের অজানা। কিন্তু কৌশল খাটিয়ে ক্ষমতায় যাওয়ার পরও যদি আওয়ামী লীগ দেশ ও জনগণের জন্য ভালো কিছু করত, তাহলেও জনগণ স্বস্তিবোধ করতে পারত। কিন্তু কোনোভাবে ক্ষমতায় যাওয়ামাত্র আওয়ামী লীগের সর্বস্তরের নেতা-কর্মীরা তালগোল পাকিয়ে ফেলে, রাজনৈতিক শিষ্টাচার ভুলে যায়, এবং একেবারে দলদাস ছাড়া সবার মাঝে তারা সরকার বিরোধী ও আওয়ামী লীগের প্রতিপক্ষ খুঁজে পায়।
এভাবে তারা আওয়ামী লীগকে কর্তৃত্ববাদী ও স্বৈরতান্ত্রিক দলে পরিণত করেছিল। সবকিছু মিলিয়ে তারা দেশে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছিল, যা থেকে তারা নিজেরাও উদ্ধার পায়নি। তারা দেশকেও বিপদের মধ্যে ফেলেছে। পঁচাত্তরের আগস্ট এবং চব্বিশের আগস্ট আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্ব নিজেরাই আমন্ত্রণ জানিয়েছিল বলা হলে কি বাড়িয়ে বলা হবে? আওয়ামী লীগ নিজের খনন করা খাদে পড়েছে। একটি বড় দল হিসেবে তারা ঘুরেফিরে বারবার ক্ষমতায় আসতে পারত। তাদের কি প্রয়োজন ছিল জাতীয়তাবাদকে উগ্র রাজনৈতিক জাতীয়তাবাদের রূপ দেওয়ার? সবাই জানে ও মানে ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’-এর চেতনা দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত পাকিস্তান রাষ্ট্রকে ব্যর্থ প্রমাণ করেছে। কি প্রয়োজন ছিল দেশবাসীকে তাদের রাজনৈতিক সমর্থনের ভিত্তিতে চিহ্নিত করে তাদেরকে ‘স্বাধীনতার পক্ষ’ ও ‘স্বাধীনতার বিপক্ষ’ শক্তি হিসেবে বিভক্ত করার?
ভোটের রাজনীতিতে সব দলকে, সব প্রার্থীকে সব পক্ষের ভোটারের কাছে গিয়েই তো ভোট ভিক্ষা করতে হয়। পাঁচ বছর পরপর যাদের কাছে গিয়ে অবনত হতে হয়, ক্ষমতায় গিয়ে তাদের ওপর খড়গহস্ত হওয়ার পরিণতি যে কখনো শুভ হয় না, বাংলাদেশে বারবার তা প্রমাণিত হয়েছে। আওয়ামী লীগ নেতারা এখনো অনলাইনে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের কোনো বিকল্প নেই’ বলে দাবি করেন। তাঁরা যদি তাঁদের নিজেদের সৃষ্ট বিপর্যয়ের কারণ অনুসন্ধান ও আত্মসমালোচনা করতেন, ভুল থেকে কিছু সবক নিতেন, তাহলে অতীতের ভুলগুলোর জন্য পঁচাত্তর-পূর্ব আওয়ামী নেতাদের দায়ী করে ২০০৯-২০২৪ মেয়াদের জাহেরি-বাতেনি অপকর্মের জন্য মানুষের জানমালের যে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, সেজন্য জাতির কাছে ক্ষমাপ্রার্থনা করা। আল্লাহ আওয়ামী লীগের দাম্ভিক নেতানেত্রীদের ক্ষমা করে মাথায় বুদ্ধিশুদ্ধি দান করুন। আমিন, ছুম্মা আমিন!
ফেসবুক টাইমলাইন থেকে