আগামী ৭-৮ জুলাই তুরস্কের আঙ্কারায় অনুষ্ঠিতব্য ন্যাটোর শীর্ষ সম্মেলনকে সামনে রেখে জোটের ভবিষ্যৎ ও নিরাপত্তা কৌশল নিয়ে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছেন বিশ্ব নেতারা। ইউরোপের নিরাপত্তা নিজেদের কাঁধে নেয়া থেকে শুরু করে প্রতিরক্ষা খাতের উৎপাদন বৃদ্ধি এমন একগুচ্ছ অভ্যন্তরীণ ও ভূ-রাজনৈতিক সংকট এখন সামরিক জোটটির সামনে প্রধান বাধা হিসেবে দাঁড়িয়েছে।
ন্যাটোর নীতিনির্ধারকরা আশঙ্কা করছেন যে, চলমান ইরান যুদ্ধ আঙ্কারা সম্মেলনটির মূল মনোযোগকে আড়াল করতে পারে। তবে জোটের মহাসচিব মার্ক রুটে এই মুহূর্তে ন্যাটোর মূল কাজ অর্থাৎ ‘প্রতিরক্ষা ও প্রতিরোধ’ ব্যবস্থার ওপরই নেতাদের মনোযোগ ধরে রাখতে জোর দিচ্ছেন।
ট্রাম্পকে
জোটে ধরে রাখা ও
৩-৫ অনুচ্ছেদের কার্যকারিতা:
ন্যাটো কর্মকর্তাদের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হলো জোটের ঐক্য
বজায় রাখা এবং যুক্তরাষ্ট্রের
প্রতিশ্রুতি নিশ্চিত করা। তবে চলতি
বছরেই দুটি বড় সংকটের
কারণে ট্রান্সঅ্যাটলান্টিক সম্পর্কে মারাত্মক ফাটল ধরেছে। মার্কিন
প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ন্যাটোভুক্ত দেশ ডেনমার্কের স্বায়ত্তশাসিত
অঞ্চল গ্রিনল্যান্ডের মালিকানা দাবি করায় প্রথম
সংকটটি তৈরি হয়।
এর পরপরই ইরান যুদ্ধ নিয়ে
ন্যাটো মিত্রদের প্রতিক্রিয়া দেখে তীব্র ক্ষোভ
প্রকাশ করেন ট্রাম্প। তিনি
ন্যাটোকে একটি ‘কাগুজে বাঘ’ হিসেবে আখ্যা
দিয়ে জোট থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে
পুরোপুরি প্রত্যাহার করে নেয়ার হুমকি
দিয়েছেন। ন্যাটোর মহাসচিব মার্ক রুটে ট্রাম্পের মন
গলানোর চেষ্টা করছেন। তিনি ট্রাম্পকে বোঝাতে
চান ইউরোপীয় সদস্যরা তাদের প্রতিশ্রুতি পূরণ করছে।
ইউরোপের
কাঁধে প্রতিরক্ষার ভার অর্পণ: ওয়াশিংটন
এখন ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে নিজেদের মনোযোগ ও সম্পদ বেশি
বরাদ্দ করতে চায়। ফলে
ট্রাম্প প্রশাসন ইউরোপীয় সরকারগুলোকে তাদের নিজেদের প্রতিরক্ষার মূল দায়িত্ব নিজেদের
কাঁধে নেয়ার জন্য চাপ দিচ্ছে।
এই পরিবর্তন ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে। ওয়াশিংটন
ন্যাটোর জন্য বরাদ্দ করা
মার্কিন সামরিক সক্ষমতার পরিধি কমিয়ে এনেছে এবং ইউরোপীয় দেশগুলো
সেই শূন্যস্থান পূরণ করার চেষ্টা
করছে।
তবে মার্কিন প্রতিরক্ষা সেক্রেটারি পিট হেগসেথ ইউরোপে মার্কিন সেনা মোতায়েন পুনর্মূল্যায়নের ঘোষণা দিয়েছেন এবং যে দেশগুলো প্রতিরক্ষা বাজেটে অবদান রাখছে না, তাদের বিরুদ্ধে ন্যাটোর পাওনা আটকে দেয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।
প্রতিরক্ষা
বাজেট ৫ শতাংশে উন্নীত
করার চাপ: রাশিয়ার আগ্রাসন
প্রতিরোধ এবং ট্রাম্পের দাবি
মেটাতে ইউরোপীয় সদস্য ও কানাডার ওপর
সামরিক বাজেট বাড়ানোর তীব্র চাপ রয়েছে।
গত বছর দ্য হেগ সামিটে ন্যাটো নেতারা ট্রাম্পের দাবি মেনে নিয়ে আগামী এক দশকের মধ্যে জিডিপির ৫ শতাংশ প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। এর মধ্যে ৩.৫ শতাংশ মূল প্রতিরক্ষা (সেনা ও অস্ত্র) এবং ১.৫ শতাংশ আনুষঙ্গিক প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় করার কথা। জোটের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ইউরোপীয় মিত্র ও কানাডা তাদের প্রতিরক্ষা বাজেট ২০ শতাংশ বাড়ালেও সব দেশ এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের পথে নেই।
প্রতিরক্ষা
শিল্পের উৎপাদন ঘাটতি ও রাশিয়ার হুমকি:
বাজেট বাড়লেও সেই অর্থকে দ্রুত
সামরিক সক্ষমতায় রূপান্তর করা ন্যাটোর জন্য
বড় পরীক্ষা। আঙ্কারা সম্মেলনে শত কোটি ডলারের
নতুন চুক্তির ঘোষণা আসার কথা থাকলেও,
কর্মকর্তারা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন যে কারখানায় উৎপাদন
কাক্সিক্ষত গতিতে বাড়ছে না। একটি অর্ডার
সরবরাহে রুপান্তর হতে এখনো কয়েক
বছর সময় লেগে যাচ্ছে।
এদিকে,
ইউক্রেন যুদ্ধ চার বছর পার
করার পর ন্যাটো নেতারা
আবারও পুনর্ব্যক্ত করতে যাচ্ছেন যে
রাশিয়া ইউরো-আটলান্টিক নিরাপত্তার
জন্য দীর্ঘমেয়াদী হুমকি। মহাসচিব রুটে সতর্ক করেছেন
যে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় বাজেটের প্রায় অর্ধেক এখন প্রতিরক্ষা খাতে
ব্যয় হচ্ছে, তাই মস্কোকে হালকাভাবে
নেয়ার কোনো সুযোগ নেই।
ইউক্রেন
তহবিল সংকট: ইউরোপের দেশগুলো দ্বিপাক্ষিক সহায়তা ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের
ঋণের মাধ্যমে কিয়েভকে অর্থায়ন চালিয়ে যাচ্ছে। তবে নিজেদের জাতীয়
বাজেটের চাপ এবং কোন
দেশ কত বেশি অবদান
রাখছে তা নিয়ে অভ্যন্তরীণ
কোন্দলের কারণে ইউক্রেনের জন্য এই বিপুল
অর্থায়ন দীর্ঘমেয়াদে বজায় রাখা ন্যাটোর
জন্য অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে
দাঁড়িয়েছে।
রয়টার্স