ইরান একটি মার্কিন এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান ঘায়েল করেছে বলে অনলাইনে ব্যাপক আলোচনা হচ্ছে। ইরান এমনটা দাবি করলেও যুক্তরাষ্ট্রের তরফ থেকে এর কোন স্বীকৃতি পাওয়া যায়নি। পেন্টাগনের দাবি, বিমানটি ইরানের বিরুদ্ধে একটি অভিযানে ছিল এবং এটি জরুরি অবতরণ করে। চীনের একজন সামরিক বিশেষজ্ঞ গ্লোবাল টাইমসকে বলেছেন, ইরানের দাবি যদি সঠিক হয়, তবে এটি স্টিলথ যুদ্ধের বিবর্তনে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হতে পারে। ১৯৯৯ সালে যুগোস্লাভ বাহিনীর হাতে একটি মার্কিন এফ-১১৭ ভূপাতিত হওয়ার পর, এটি হবে আরেকটি ঘটনা যেখানে অজেয় বলে বিবেচিত স্টিলথ বিমান এমন ভূখণ্ডে গিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যেখানে মার্কিন বাহিনীর আকাশে শ্রেষ্ঠত্ব রয়েছে বলে মনে করা হয় — যা “অভেদ্যতা”র ধারণার প্রতি একটি চ্যালেঞ্জ।
শুক্রবার সিএনএন-এর এক প্রতিবেদন জানায়, বিষয়টি সম্পর্কে অবগত দুটি সূত্র দাবি করেছে যে, ইরানের গুলিতে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর একটি মার্কিন এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান মধ্যপ্রাচ্যের একটি মার্কিন ঘাঁটিতে জরুরি অবতরণ করেছে। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের মুখপাত্র টিম হকিন্স বলেছেন যে, পঞ্চম প্রজন্মের স্টেলথ জেটটি “ইরানের আকাশে একটি যুদ্ধ মিশনে উড়ছিল”। এটি জরুরি অবতরণ করতে বাধ্য হয়। হকিন্স দাবি করেন যে বিমানটি নিরাপদে অবতরণ করেছে এবং ঘটনাটি তদন্ত করা হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল-ইরান সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল উভয়ই এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান ব্যবহার করছে; সিএনএন জানিয়েছে, এই বিমানগুলোর দাম ১০০ মিলিয়ন ডলারেরও বেশি।
একই দিনে ইরানের ইসলামিক রিপাবলিক নিউজ এজেন্সি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ‘এক্স’-এ একটি ভিডিও পোস্ট করে, যেখানে দাবি করা হয় যে ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা একটি এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানকে লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছে।
ফুটেজে দেখা যায়, ইরান একটি ইনফ্রারেড সেন্সরের মাধ্যমে এফ-৩৫ বিমানটিকে শনাক্ত করে।
বেইজিং-ভিত্তিক অ্যারোস্পেস নলেজ ম্যাগাজিনের প্রধান সম্পাদক ওয়াং ইয়ানান রবিবার (২২ মার্চ) গ্লোবাল টাইমসকে বলেন যে, ধারাবাহিক বিমান হামলার মুখে ইরানের পক্ষে বড় আকারের আগাম সতর্কীকরণ রাডার মোতায়েন করা কঠিন হতে পারে, কারণ এগুলো আকারে বড়, সহজে স্থানান্তরযোগ্য নয় এবং শনাক্ত ও নিষ্ক্রিয় করার ক্ষেত্রে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
তিনি উল্লেখ করেন যে, এফ-৩৫-এর মতো স্টিলথ বিমানগুলো রাডারে শনাক্ত হওয়া এড়ানোর জন্যই ডিজাইন করা হয়েছে, তাই ইরান এর পরিবর্তে হয়তো ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ও স্থানান্তরযোগ্য রাডার-বহির্ভূত শনাক্তকরণ পদ্ধতির ওপর বেশি নির্ভর করেছে, বিশেষ করে ইনফ্রারেড অনুসন্ধান ক্ষমতার ওপর, এবং সম্ভবত একটি নিম্ন থেকে মাঝারি উচ্চতার ইনফ্রারেড নজরদারি নেটওয়ার্ক তৈরি করেছে।
ওয়াং বলেন, নিম্ন উচ্চতায় ইনফ্রারেড শনাক্তকরণ তুলনামূলকভাবে কার্যকর। যদিও এর পাল্লা সীমিত এবং দূর থেকে শনাক্তকরণের জন্য অপর্যাপ্ত, তবে এটিকে স্বল্প-পাল্লার বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সাথে যুক্ত করা যেতে পারে, যেমন—মানুষ-বহনযোগ্য বা যানবাহনে-স্থাপিত ইনফ্রারেড-নির্দেশিত ক্ষেপণাস্ত্র। এই ব্যবস্থাগুলোর বৈশিষ্ট্য হলো উচ্চ গতিশীলতা এবং গোপনীয়তা, যা সাধারণত “শনাক্ত করো, গুলি চালাও এবং স্থান পরিবর্তন করো” কৌশল ব্যবহার করে।
এই চীনা বিশেষজ্ঞ উল্লেখ করেন যে, যদিও এফ-৩৫-এর রাডার স্টিলথে সুস্পষ্ট সুবিধা রয়েছে, তবে এর ইনফ্রারেড সিগনেচার কমানো সম্ভব কিন্তু পুরোপুরি নির্মূল করা যায় না। শীতল পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতিতে এর ইঞ্জিনের তাপ শনাক্তযোগ্য থাকে। এমন ক্ষেত্রে, ইরানের যদি সামান্যতম ইনফ্রারেড শনাক্তকরণ সক্ষমতাও থাকে, তবে তারা বিমানটিকে শনাক্ত করে সেটির ওপর হামলা চালাতে পারে।
ঘটনার আগে, মার্কিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রী পিট হেগসেথ বৃহস্পতিবার সকালে পেন্টাগনের এক ব্রিফিংয়ে দাবি করেন যে ইরানের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা “ভেঙে দেওয়া হয়েছে” এবং প্রতিশ্রুতি দেন যে পরের হামলাটি হবে “এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় হামলা প্যাকেজ”।
ওয়াং বলেন, মার্কিন বাহিনী যদি মনে করে যে তারা আকাশে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেছে, তবে কার্যকারিতা বাড়ানোর জন্য হামলা অভিযানে বিমানগুলো হয়তো নিচু উচ্চতায় উড়েছে। তবে, তাতেও সেগুলো স্বল্প-পাল্লার বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার নাগালের মধ্যে চলে আসত।
প্রকাশিত ফুটেজ যদি আসল হয়, তবে সম্ভবত ক্ষেপনাস্ত্রের আঘাতটি তুলনামূলকভাবে কাছাকাছি দূরত্বে—কয়েক কিলোমিটার থেকে মোটামুটি বারো কিলোমিটারের মধ্যে—ঘটেছিল। এমন দূরত্বে, একবার ইনফ্রারেড-নির্দেশিত ক্ষেপণাস্ত্র লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হলে বিমানের পালানোর সুযোগ থাকে সীমিত।
বিশেষজ্ঞ আরও বলেন যে, যদি একযোগে একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হতো, তবে সফলভাবে আঘাত হানার সম্ভাবনা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যেত, তাহলে সম্ভবত বিমানটিকে পালাতে পারত না।
ওয়াং আরও উল্লেখ করেন যে, এই ঘটনাটি স্টিলথ যুদ্ধের বিবর্তনে তাৎপর্যপূর্ণ।
তিনি বলেন, ১৯৯৯ সালে যুগোস্লাভ বাহিনীর হাতে একটি মার্কিন এফ-১১৭ বিমান ভূপাতিত হওয়ার পর, এটি এমন আরেকটি ঘটনা যেখানে প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত বলে ব্যাপকভাবে বিবেচিত একটি স্টিলথ বিমান এমন একটি পরিবেশে আক্রান্ত হয়েছে, যেখানে প্রতিপক্ষ আকাশপথে তেমন কোনো হুমকি সৃষ্টি করবে বলে মনে করা হয়নি। এর ফলে স্টিলথ “অভেদ্যতা”র ধারণাটি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।
ওয়াং বলেন, এই ঘটনা আংশিকভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস থেকে উদ্ভূত হতে পারে। পরবর্তী অভিযানগুলোতে এর প্রভাব পড়তে পারে।
ইনফ্রারেড-নির্দেশিত ক্ষেপণাস্ত্রগুলো সাধারণত স্বল্প-পাল্লার বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সাথে যুক্ত থাকে এবং এগুলোর বিস্তৃত এলাকা জুড়ে সুরক্ষা দেওয়ার ক্ষমতা নেই, তাই ইরানের আকাশে সামগ্রিক শ্রেষ্ঠত্ব এবং বৃহত্তর যুদ্ধক্ষেত্রে এগুলোর প্রভাব সীমিত। তবে, এগুলো মার্কিন বাহিনীর জন্য পরিচালন ব্যয় বাড়াতে পারে এবং স্টিলথ বিমানের আরও সতর্ক ব্যবহারে উৎসাহিত করতে পারে; যেমন, উড্ডয়নের উচ্চতা, উড্ডয়নের সময় এবং অভিযানিক আকাশসীমার উপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা, যা মার্কিন ও ইসরায়েলি অভিযানের উপর বোঝা বাড়িয়ে দেবে, বিশেষজ্ঞ আরও যোগ করেন।
গ্লোবাল টাইমস থেকে অনুবাদ