বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক সামনে কেমন হতে পারে

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক সামনে কেমন হতে পারে

এটা কোনো গোপন কথা নয় যে বাংলাদেশে ভারতবিরোধিতা এখন বেশ তুঙ্গে। আবার ভারতে বাংলাদেশের জন্য সৌহার্দ্যের বন্যা বইছে, এমন কথাও বলা যাবে না। ৫ আগস্টের পর এই বৈরিতা সীমান্তের দুই পাশেই আরও স্পষ্টভাবে বিস্তার পেয়েছে। সম্পর্কের এই টানাপোড়েন নিয়ে কিছুটা লেখালেখি হয়েছে। কিন্তু অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে বিষয়টি নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করা খুব সহজ ছিল না।

৫ আগস্ট থেকেই দুই দেশের সম্পর্কে যেন একধরনের বরফ জমে আছে। দুই দেশের কোনো সরকারই এই বরফ ভাঙতে দৃশ্যমান উদ্যোগ নেয়নি। ভারত ধরে নিয়েছিল, মাহফুজ ও নাহিদদের প্রভাব ডিঙিয়ে ইউনূস সরকারের সঙ্গে নতুন করে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়া সম্ভব হবে না; তাই অপেক্ষাই ভালো। অন্যদিকে অধ্যাপক ইউনূসের নীতিনির্ধারকেরাও ‘দিল্লি না ঢাকা’ অনুভূতির বাইরে গিয়ে কোনো বড় উদ্যোগ নিতে সাহস করেননি।

যদিও এই বরফাচ্ছন্ন পরিস্থিতির মধ্যেও সম্পর্কে মোটামুটি একটি স্থিতিশীলতা ছিল। তবে মাঝেমধ্যে দুই দেশের না–বাদীরা নানা উপায়ে সেই স্থিতাবস্থা নড়বড়ে করার চেষ্টা করেছেন। যেমন উত্তর–পূর্ব ভারতের সাত রাজ্য নিয়ে বাংলাদেশের কিছু স্বপ্নবাদী মানুষ বিভিন্ন ধরনের মানচিত্র এঁকে ভারতীয়দের ক্ষুব্ধ করেছেন। আবার ভারতের উগ্রবাদীরাও বাংলাদেশের কিছু বিচ্ছিন্ন মব ঘটনার অতিরঞ্জিত ব্যাখ্যা দিয়ে সাম্প্রদায়িকতার প্রচারণা ছড়িয়েছেন। হিন্দু ধর্মগুরুদের শান্ত করতে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড আইপিএল থেকে মোস্তাফিজকে বাদ দিয়েছে, এতে এ দেশের জনতার ক্ষোভও বেড়েছে। এসব ঘটনা উত্তেজনা তৈরি করেছে, কিন্তু স্থিতাবস্থা বা স্ট্যাটাস কো ভাঙতে পারেনি।

বরফের নিচের স্থিতাবস্থা

ঠান্ডা দেশের শীতে পুকুর, বিল বা নদীর পানির উপরিভাগ জমে বরফ হয়ে যায়। তাপমাত্রা যত কমে, সেই বরফ তত শক্ত হয়। কিন্তু শক্ত বরফের নিচে পানি ঠিকই প্রবাহিত হয়, শ্যাওলা জন্মায় ও মাছেরা সাঁতার কাটে। অনেক সময় ওপরকার বরফই নিচের পানির তাপ ধরে রাখার ইনসুলেটরের মতো কাজ করে।

ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্কেও ওপরকার বরফ একধরনের স্থবিরতা তৈরি করেছে। কিন্তু সেই স্থবিরতা দুই দেশের সরকারকে সুযোগ দিয়েছে বিরোধীদের দৃষ্টি এড়িয়ে ভেতরে ভেতরে একটি স্থিতাবস্থা বজায় রাখতে। দুই দেশের সম্পর্কের বর্তমান অবস্থা বুঝতে হলে মোটামুটি তিনটি পরিমাপের দিকে তাকালেই চলে। সীমান্ত, বাণিজ্য এবং রাজনীতি ও কূটনীতি। এর বাইরে অবশ্য আরও অনেক বিষয় আছে। যেমন সৌহার্দ্য, ভিসানীতি, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, গণমাধ্যমের আলোচনাও গুরুত্বপূর্ণ। তবে এসবই মূলত ওই তিন ক্ষেত্রের প্রতিফলন। এই তিনটির যেকোনো একটিতে সমস্যা তৈরি হলে অন্য ক্ষেত্রেও তার প্রভাব দেখা যায়।

সীমান্ত

বাংলাদেশ ও ভারতের সীমান্তে ভূখণ্ডগত বড় কোনো বিরোধ নেই। তবু মাঝেমধ্যে কিছু সহিংস ঘটনা ঘটত, যার বেশির ভাগই ছিল অসামরিক। তবে বর্তমানে বাংলাদেশ–ভারত সীমান্ত তুলনামূলকভাবে শান্ত। এর জন্য দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর নেতৃত্বকে কৃতিত্ব দিতেই হয়। আগে যে সমস্যাগুলো ছিল, বিশেষ করে সীমান্তে বাংলাদেশি হত্যা, তা অনেকটাই কমে এসেছে।

কিছু ভারতীয় পুশ–ইনের ঘটনা এখনো ঘটে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এগুলো ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির সঙ্গে সম্পর্কিত। যেসব লোককে বাংলাদেশের ভেতরে ঠেলে দেওয়া হয়, সীমান্তরক্ষী বাহিনীর আলোচনার মাধ্যমে তাদের অনেককেই আবার ফিরিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

বাংলাদেশ–ভারত সীমান্ত পৃথিবীর দীর্ঘতম সীমান্তগুলোর একটি। এর দৈর্ঘ্য ৪০৯৬ কিলোমিটার বা প্রায় ২৫৪৫ মাইল। এত দীর্ঘ সীমান্তে বর্তমান পরিস্থিতি অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশ শান্ত।

বাণিজ্য

আজকের পৃথিবীতে কোনো দেশই পুরোপুরি স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়। যেসব প্রয়োজনীয় পণ্যের নিজস্ব উৎপাদন কম, সেগুলো আমদানি করতে হয়। আবার যেসব পণ্য উদ্বৃত্ত, সেগুলো রপ্তানি করে আমদানির ঘাটতি পূরণ করা হয়। প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে এই আদান–প্রদান হলে পরিবহন খরচ ও সময় কম লাগে। পণ্যের ধরন ও মানও অনেক সময় দুই দেশের ভোক্তার চাহিদার কাছাকাছি থাকে।

এই কারণেই নানা রাজনৈতিক সমস্যার মধ্যেও বাংলাদেশ–ভারত বাণিজ্য বাড়তেই থাকে। চাল ও পেঁয়াজের মতো পণ্য তো আছেই, গার্মেন্ট শিল্পের জন্য ভারতীয় সুতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখন সেই সুতা সমুদ্রবন্দর দিয়েও আসছে। বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি জানিয়েছেন, গত অর্থবছরে ভারত থেকে সুতা আমদানি বেড়েছে ১৩৭ শতাংশ। শুধু সুতা নয়, প্রায় প্রতিটি খাতেই ভারত থেকে আমদানি বেড়েছে। হিসাব বলছে, গত অর্থবছরে ভারত থেকে মোট আমদানি বেড়েছে প্রায় ৭ দশমিক ৮ শতাংশ।

রাজনীতি কূটনীতি

বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কের সবচেয়ে বড় ঘাটতি এখন রাজনীতি ও কূটনীতিতে। বাংলাদেশে জুলাই বিপ্লব ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারতে আশ্রয় নেওয়ার পর দুই দেশের কূটনৈতিক টানাপোড়েন তীব্র হয়।

তবে এই দ্বন্দ্বের শুরু তারও আগে। শেখ হাসিনা ভারতের সমর্থন নিয়ে প্রায় ১৫ বছর বাংলাদেশে কর্তৃত্ববাদী শাসন চালিয়েছেন বলে সমালোচকেরা মনে করেন। গণতান্ত্রিক নির্বাচন ও রাজনৈতিক সংস্কারের বিষয়ে আন্তর্জাতিক চাপও তিনি দীর্ঘদিন উপেক্ষা করেছেন। ফলে বাংলাদেশের জনগণের একটি বড় অংশ সেই শাসনের জন্য ভারতকেই দায়ী করে এসেছে।

৫ আগস্টের পর তরুণদের মুখে ‘ভারতীয় আগ্রাসন’ নিয়ে তীব্র প্রতিবাদ শোনা গেছে। কেউ কেউ এর সঙ্গে নতুন নতুন ষড়যন্ত্রতত্ত্বও জুড়ে দিয়েছেন। যেমন ভারতের সঙ্গে হাসিনার গোপন চুক্তি কিংবা বাংলাদেশের ওপর দিয়ে ভারতের একতরফা ট্রানজিটের অভিযোগ।

অন্তর্বর্তী সরকারের এক ছাত্র উপদেষ্টা এমন দশটি চুক্তি বাতিলের কথাও বলেছিলেন। কিন্তু বিদায়ী পররাষ্ট্র উপদেষ্টা পরে জানান, যে তালিকা ছড়ানো হয়েছিল তার বেশির ভাগ চুক্তিই বাস্তবে অস্তিত্বহীন। এসব অভিযোগের অনেকগুলো পরে ভুল প্রমাণিত হলেও জনমনে যে ধারণা তৈরি হয়েছে, তা এখনো পুরোপুরি দূর হয়নি।

ভবিষ্যৎ সম্পর্ক, বরফ কি গলবে

আগেই বলা হয়েছে, দুই দেশের সম্পর্কে মূল জট রাজনীতি ও কূটনীতিতে। সম্প্রতি সেই জায়গায় কিছু নড়াচড়া দেখা যাচ্ছে, যদিও পরিবর্তন এখনো খুব দৃশ্যমান নয়। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট, দুই পক্ষই কিছুটা নমনীয় হচ্ছে।

সাম্প্রতিক সময়ে এই অঞ্চলের ভূরাজনীতিতেও বড় পরিবর্তন এসেছে। প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ভারতকে এই অঞ্চলের নেতৃত্বের বড় অংশীদার হিসেবে দেখত। ডোনাল্ড ট্রাম্প সেই ধারণা থেকে সরে এসে ছোটবড় সব দেশের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কের নীতি জোরদার করেছেন। ফলে আঞ্চলিক ক্ষমতার ভারসাম্যেও কিছু পরিবর্তন এসেছে।

বাংলাদেশেও রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটেছে নির্বাচনের মাধ্যমে। বিএনপি বড় বিজয় নিয়ে ক্ষমতায় এসেছে এবং তারেক রহমান এখন প্রধানমন্ত্রী। ইউনূস সরকারের সময়ে তরুণ ছাত্রনেতাদের যে প্রভাব ছিল, এখন তা নেই। বৈদেশিক নীতিতে বিএনপি তাদের নিজস্ব হিসাবেই এগোতে চাইবে।

এই দুটি পরিবর্তনই নতুন সময়ে বাংলাদেশ–ভারত সম্পর্ককে প্রভাবিত করছে। সম্প্রতি দুই দেশের নেতারা এমন কিছু উদ্যোগ নিয়েছেন, যা একে অন্যকে এগিয়ে আসতে উৎসাহিত করছে।

বাংলাদেশিদের জন্য ভারতীয় ভিসা চালু হওয়া এখন সময়ের অপেক্ষা মাত্র। বাংলাদেশ সরকারও প্রায় দুই মাস বিরতির পর দিল্লি ও আগরতলায় তাদের মিশন থেকে ভারতীয় নাগরিকদের ভিসা দেওয়া আবার শুরু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে কলকাতা–ত্রিপুরা পরিবহনও সীমিত আকারে আবার চালু হয়েছে।

ভারতের অনলাইন সংবাদমাধ্যম দ্য প্রিন্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঢাকায় নতুন সরকার ক্ষমতা নেওয়ার কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের প্রধান মেজর জেনারেল মোহাম্মদ কায়সার রশিদ চৌধুরী নয়াদিল্লি সফর করেন। সেখানে তিনি বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার প্রধানদের সঙ্গে বৈঠক করেন এবং সম্পর্ক স্বাভাবিক করার বিষয়ে আলোচনা হয়।

রোজার সময় ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশন বাংলাদেশের রাজনীতিবিদ ও বিশিষ্টজনদের জন্য ইফতার মাহফিলের আয়োজন করেছে। এর আগে বিরোধীদলীয় নেতা নির্বাচিত হওয়ার পর জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিক্রম মিশ্রি।

ভারতের এই অন্তর্ভুক্তিমূলক উদ্যোগ শেখ হাসিনার আমলে এমনকি অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও কল্পনা করা কঠিন ছিল। তখন মোদির নীতি ছিল মূলত আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পর্কের ওপর নির্ভরশীল। অনেক ভারতীয় থিঙ্কট্যাংক তখনই এই এক ঝুড়িতে সব ডিম রাখার নীতির সমালোচনা করেছিলেন।

এটাও হয়তো কাকতালীয় নয় যে দীর্ঘদিন পর ভারতের পুলিশ ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক ওসমান হাদি হত্যার প্রধান আসামি ফয়সাল করিম মাসুদ ও তার সহযোগী আলমগীরকে গ্রেপ্তার করেছে।

বিএনপিও ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে আগ্রহী। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, হাসিনার ভারত অবস্থান এই ক্ষেত্রে কোনো প্রতিবন্ধকতা হবে না। তবে বিএনপি সম্ভবত ধীরগতিতেই এগোবে এবং রাজপথের প্রতিক্রিয়াও বিবেচনায় রাখবে। বাংলাদেশে এখনো অনেক না–বাদী আছেন, যারা ভারতের উদ্দেশ্য নিয়ে সন্দিহান। দিল্লি না ঢাকা বিতর্ক যত দিন রাজপথে থাকবে, তারেক রহমানও হয়তো কিছুটা সতর্কভাবেই এগোবেন।

তবে ধীরগতিতেই হোক, সম্পর্কের ইতিবাচক দিকগুলো সামনে রেখে দুই দেশের সরকার যদি আন্তরিকভাবে এগোয়, তাহলে ধীরে ধীরে সম্পর্কের উষ্ণতা বাড়বে। আর তখনই হয়তো জমে থাকা বরফ গলতে শুরু করবে।

প্রথম আলো থেকে নেয়া