যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের উত্তেজনা কখনোই শুধু এই দুই দেশের মধ্যেই সীমিত থাকে না। ইরানের ভেতরে সাম্প্রতিক বিক্ষোভে বহু মানুষের মৃত্যুর খবরের পর ওয়াশিংটন ও তেহরানের বক্তব্য আরও কঠোর হয়ে ওঠে। তখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশ্যে বিক্ষোভকারীদের পক্ষে হস্তক্ষেপের কথা বলেন।
এতে উপসাগরীয় অঞ্চলে কূটনীতির প্রয়োজন আরও বেড়ে যায়। এই অঞ্চলের ভৌগোলিক অবস্থান, গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি স্থাপনা এবং একে অপরের সঙ্গে জড়ানো নিরাপত্তাব্যবস্থার কারণে ছোটখাটো সংঘাতও দ্রুত বড় সংকটে রূপ নিতে পারে। এই বাস্তবতায় কাতার সব সময় উত্তেজনা কমানো, মধ্যস্থতা করা এবং রাজনৈতিক যোগাযোগ খোলা রাখার ওপর জোর দিয়েছে, বিশেষ করে যখন এসব যোগাযোগ ভেঙে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে তীব্র সংকটের সময়ে কাতার কার্যকর ও বিশ্বাসযোগ্য মধ্যস্থতাকারী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। তেহরানের সঙ্গে ধারাবাহিক সম্পর্ক এবং ওয়াশিংটনের সঙ্গে কৌশলগত অংশীদারত্বের কারণে দোহা এমন গোপন ও নির্ভরযোগ্য যোগাযোগের পথ খোলা রাখতে পেরেছে, যা সরাসরি আলোচনা রাজনৈতিকভাবে কঠিন হয়ে পড়লে কাজে আসে। এর মাধ্যমে কাতার এমন সমাধানে সহায়তা করেছে, যা উভয় পক্ষের মুখরক্ষা করেছে এবং সংঘাত বাড়ার ঝুঁকি কমিয়েছে।
এই ভূমিকার সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণ দেখা যায় ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে, যখন কাতার যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে বন্দিবিনিময় এবং মানবিক প্রয়োজনে জব্দ থাকা ইরানি অর্থ ছাড়ের প্রক্রিয়ায় মধ্যস্থতা করে। মাসের পর মাস পরোক্ষ আলোচনা, সূক্ষ্ম সমন্বয় এবং রাজনৈতিক আশ্বাস ছাড়া এই সমঝোতা সম্ভব হতো না। এই চুক্তি বড় কোনো সম্পর্ক উন্নয়নের ইঙ্গিত না দিলেও একটি বিষয় স্পষ্ট করেছে। গভীর বৈরিতার মধ্যেও বিশ্বাসযোগ্য মধ্যস্থতা থাকলে কূটনীতি সম্ভব।
কাতারের কাছে এই মধ্যস্থতা কোনো চূড়ান্ত লক্ষ্য নয়। এর পেছনে রয়েছে একটি বিস্তৃত উপলব্ধি—ইরানের পারমাণবিক ইস্যু কিংবা যুক্তরাষ্ট্র–ইরান উত্তেজনা কেবল বলপ্রয়োগের মাধ্যমে দীর্ঘ মেয়াদে সামাল দেওয়া যাবে না। কাতার ধারাবাহিকভাবে মনে করে যে সামরিক পথ নয়, সংলাপই ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ ও সংঘাত এড়ানোর একমাত্র টেকসই উপায়।
এর মানে এই নয় যে কাতার ইরানের আঞ্চলিক ভূমিকা বা বিস্তারবাদ নিয়ে উদাসীন। বরং এটি ব্যয়ের হিসাব, অনিশ্চয়তা এবং অনাকাঙ্ক্ষিত পরিণতির বাস্তব মূল্যায়ন। এ কারণেই ২০২৫ সালের জুনে যুক্তরাষ্ট্রের ইরানি পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার জবাবে কাতারে অবস্থিত আল উদেইদ ঘাঁটিতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর দোহা দ্রুত উভয় পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগে যায়। জরুরি কূটনৈতিক তৎপরতা ও বিদ্যমান চ্যানেলের মাধ্যমে কাতার একটি নাজুক হলেও কার্যকর যুদ্ধবিরতি টিকিয়ে রাখতে ভূমিকা রাখে।
ইরানের শাসনব্যবস্থা উচ্ছেদের লক্ষ্যে কোনো সামরিক অভিযান হলে তার প্রভাব ইরানের সীমানায় আটকে থাকবে না। দেশের ভেতরে রাষ্ট্রীয় কাঠামো ভেঙে পড়া, কর্তৃত্বের বিভাজন এবং জাতিগত ও সাম্প্রদায়িক রাজনীতির পুনরুত্থানের ঝুঁকি তৈরি হবে। বাইরে এর প্রভাব পড়তে পারে প্রতিবেশী দেশগুলোতে শরণার্থী স্রোত, উপসাগরীয় অঞ্চলে নৌ–নিরাপত্তার সংকট এবং জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতার মাধ্যমে। এসবই উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য তাৎক্ষণিক ও গুরুতর চ্যালেঞ্জ।
সাম্প্রতিক সময়ের ঘটনাপ্রবাহ ইতিমধ্যে কৌশলগত ভারসাম্য বদলে দিয়েছে। ৭ অক্টোবরের হামলার পর আঞ্চলিক সংঘাতে ইরানের ঘনিষ্ঠ সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো সামরিক ও রাজনৈতিকভাবে চাপের মুখে পড়েছে। এতে কিছু এলাকায় তেহরানের প্রভাব কমেছে। একই সঙ্গে ২০২৫ সালের জুনে যুক্তরাষ্ট্রের হামলা দেখিয়ে দিয়েছে যে ওয়াশিংটন সরাসরি ইরানে আঘাত হানতে প্রস্তুত এবং পারমাণবিক সক্ষমতা দুর্বল করতে দৃঢ়।
তবে উপসাগরীয় দৃষ্টিভঙ্গি থেকে আরও উত্তেজনা বাড়ানোর সুফল ক্রমেই কমে আসছে। ইরানের প্রভাব দুর্বল হলেই যে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা আসবে, এমন নয়, বিশেষ করে যদি সেই পথ রাষ্ট্র ভাঙনের দিকে নিয়ে যায়। উপসাগরীয় দেশগুলোর লক্ষ্য ইরানের রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে নাটকীয়ভাবে বদলে দেওয়া নয়, বরং এমন বিশৃঙ্খলা এড়ানো, যা ব্যয়বহুল, অনিশ্চিত এবং নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। এই মূল্যায়ন শুধু কাতারের নয়।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সৌদি আরব ও ওমানও সংলাপ ও আস্থাবর্ধক পদক্ষেপের মাধ্যমে তেহরানের সঙ্গে উত্তেজনা কমানোর পথে হাঁটছে। তাদের উদ্যোগে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বকে সামরিক উত্তেজনার ঝুঁকি বোঝানোর চেষ্টা ছিল এই অঞ্চলের সামগ্রিক মনোভাবের প্রতিফলন।
এই প্রেক্ষাপটে কাতারের মধ্যস্থতা আঞ্চলিক বিশৃঙ্খলা ঠেকানোর একটি বাস্তব পথ দেখায়। যোগাযোগ চালু রাখা, সীমিত সমঝোতা সম্ভব করা এবং চরমপন্থী কৌশল নিরুৎসাহিত করার মাধ্যমে দোহা ভুল হিসাবের ঝুঁকি কমাতে চায়। এসব উদ্যোগ চোখে পড়ার মতো বড় সাফল্য আনে না এবং অনেক সময় ইচ্ছাকৃতভাবেই আড়ালে থাকে। কিন্তু এসব না থাকলে সংঘাত আরও সহজেই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেত।
একটি ক্রমবর্ধমান মেরুকৃত অঞ্চলে উত্তেজনা কমানোর মূল্য সহজেই অবমূল্যায়িত হয়। এটি সামরিক শক্তির প্রদর্শনের মতো দৃশ্যমান নয়, কিংবা কঠোর প্রতিরোধের মতো সরলও নয়। তবু ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে কাতারের ভূমিকা দেখায় যে সীমিত, ধীর এবং অসম্পূর্ণ হলেও কূটনীতিই এখনো এমন একটি উপায়, যা বড় যুদ্ধ এড়াতে পারে। যে অঞ্চলে যুদ্ধের মূল্য কেবল যুদ্ধক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ থাকে না, সেখানে কাতারের এই ভূমিকা হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই।
মূল: আল–জাজিরা, প্রথম আলো থেকে নেওয়া