ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি, তাঁর নিরাপত্তা উপদেষ্টা আলী শামখানি ও ইসলামী বিপ্লবী গার্ডের প্রধান মোহাম্মদ পাকপুরসহ দেশটির নেতৃত্বে থাকা বেশ কয়েকজন গত শনিবার যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যৌথ হামলায় নিহত হয়েছেন। তাঁদের নিহত হওয়ার ঘটনা এ অঞ্চলের জন্য ভূমিকম্পসম। কেননা এ ঘটনায় পুরো অঞ্চলজুড়ে নজিরবিহীন এক উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে।
তবে উত্তেজনার মাত্রা নজিরবিহীন হলেও এর পেছনের যুক্তি নতুন নয়। কয়েক দশক ধরে মার্কিন প্রশাসন গোপনে ও প্রকাশ্যে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক এবং সামরিক বিষয়ে হস্তক্ষেপ করে চলেছে। এর মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র সরকারগুলো পুনর্গঠন, প্রতিপক্ষকে উৎখাত ও এই অঞ্চলে ক্ষমতার ভারসাম্য নতুনভাবে নির্ধারণ করেছে। বর্তমান সংকট এ চক্রেরই পুনরাবৃত্তির ইঙ্গিত।
ইরানে গণতন্ত্রকে শ্বাস রোধ করা
মধ্যপ্রাচ্যকে নিজের আধিপত্যে আনার যুক্তরাষ্ট্রের ইচ্ছার শুরু সেই ১৯৫০–এর দশক থেকে; মূলত তেল ও বাণিজ্যের প্রশ্নকে ঘিরে।
ওই সময় ওয়াশিংটন নিজের তেলের জোগান ও মধ্যপ্রাচ্যে কৌশলগত অবস্থান নিশ্চিত করতে সৌদি আরবের সঙ্গে একটি যুদ্ধকালীন অংশীদারত্বের সম্পর্ক স্থাপন করে। অন্যদিকে ইরান যুক্তরাজ্যের সঙ্গে নিজেদের তেলচুক্তি পুনর্বিন্যাসের উদ্যোগ নেয়।
১৯৫১ সালে ইরানের জনপ্রিয় প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ মোসাদ্দেকের নেতৃত্বে ইরানি পার্লামেন্ট শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভির ক্ষমতা সীমিত করার ও দেশের বিশাল তেল সম্পদের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ার চেষ্টা শুরু করে।
মোসাদ্দেক তেলশিল্প জাতীয়করণ করেন ও দেশে রাজতন্ত্রকে চ্যালেঞ্জ জানান। এর জেরে যুক্তরাজ্য ইরানের তেল রপ্তানিতে অবরোধ আরোপ করে। এ কারণে দেশটির ভেতরে রাজনৈতিক সংঘাত আরও গভীর হয়।
তেহরান ও লন্ডনের মধ্যে বিরোধ মেটাতে প্রধানমন্ত্রী মোসাদ্দেক ওয়াশিংটনকে নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারী হিসেবে দেখেছিলেন। কিন্তু তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোয়াইট ডি আইজেনহাওয়ার প্রশাসনের লক্ষ্য ছিল ভিন্ন।
১৯৫৩ সালে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে মিলে ইরানে প্রধানমন্ত্রী মোসাদ্দেকের বিরুদ্ধে একটি অভ্যুত্থান ঘটাতে সহায়তা করে। তারা ইরানে বিক্ষোভে অর্থায়ন, সামরিক জোট তৈরি ও রাজনৈতিক পরিবেশ অস্থিতিশীল করে তোলে। ওই বছর আগস্ট মাসে রাজতন্ত্রপন্থী কর্মকর্তারা ট্যাংকসহ মোসাদ্দেকের বাসভবন ঘেরাও করে নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত ও শাহর ক্ষমতা পাকাপোক্ত করেন।
এবার ইরানের ওপর যুক্তরাজ্যকে আর একক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার সুযোগ দেয়নি ওয়াশিংটন; বরং ইরানকে একটি মার্কিন নেতৃত্বাধীন তেল কনসোর্টিয়াম গঠনের দিকে ঠেলে দেয় ওয়াশিংটন, যেন পশ্চিমা কোম্পানিগুলোও ইরানের তেল থেকে মুনাফা পেতে পারে।
একই সঙ্গে সিআইএ শাহর নতুন নিরাপত্তা সংস্থা ‘সাবাক’ গড়ে তুলতে সহায়তা করে। সিআইএ সাবাক সদস্যদের প্রশিক্ষণও দিত। পরে ভিন্ন–মতাবলম্বীদের ওপর নজরদারি, তাঁদের দমন করা ও অত্যাচারের জন্য শাহর এ বাহিনী কুখ্যাত হয়ে ওঠে।
প্রধানমন্ত্রী মোসাদ্দেকের বিরুদ্ধে ওই অভ্যুত্থান ইরানে শক্তিশালী স্বৈরশাসন প্রতিষ্ঠা করে এবং ইরানের রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে পশ্চিমা কৌশলগত স্বার্থের সঙ্গে যুক্ত করে দেয়।
মস্কোর স্বাধীন গবেষণাপ্রতিষ্ঠান প্রিমাকভ ইনস্টিটিউট অব ওয়ার্ল্ড ইকোনমি অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল রিলেশনসের প্রধান গবেষক ও মস্কোর এইচএসই বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক নিকোলাই সুকহভ আরটিকে বলেন, ইরানের এই নতুন ধারা যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ মধ্যপ্রাচ্য নীতিকে অনেকটাই সংজ্ঞায়িত করেছিল।
সুকহভ জোর দিয়ে বলেন, ওয়াশিংটনের কর্মকাণ্ডের মূল চালিকা শক্তি দীর্ঘদিন ধরে কৌশলগত সম্পদ, বিশেষ করে জ্বালানি খাত নিয়ন্ত্রণে রাখার মধ্যে নিহিত।
নিজ মহাদেশে ভূরাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করা থেকে শুরু করে পরবর্তী সময়ে সম্পদসমৃদ্ধ বিদেশি অঞ্চলে হস্তক্ষেপ পর্যন্ত, মার্কিন নীতি বারবার নিজের অর্থনৈতিক অগ্রাধিকার অনুসরণ করেছে। তারা প্রথমে ভূমি ও কৌশলগত পথের নিয়ন্ত্রণ নেয়, তারপর সেখানকার প্রাকৃতিক সম্পদে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করে।
১৯৭৯ সালে ইসলামী বিপ্লবের মাধ্যমে ইরানে রাজতন্ত্রের পতন হয়। এ বিপ্লবের কেন্দ্রেও ছিল বিদেশি হস্তক্ষেপের স্মৃতি। শাহর পতনের পর বিপ্লবী শিক্ষার্থীরা তেহরানে মার্কিন দূতাবাসে প্রবেশ করে এটিকে গুপ্তচরদের আড্ডা হিসেবে ঘোষণা করেন ও ৪৪৪ দিন ধরে মার্কিন কূটনীতিকদের জিম্মি করে রাখেন।
এ সংকট ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে দেয় এবং দুই দেশের মধ্যে শত্রুতার একটি চক্র শুরু হয়, যা পরে মার্কিন-ইরান সম্পর্ককে ভিন্ন রূপ দিয়েছে।
সুয়েজ ১৯৫৬: উপনিবেশ পুনঃপ্রতিষ্ঠার ব্যর্থ চেষ্টা
ইরানে ইসলামী বিপ্লব অন্য একটি সংকটের পথ উন্মোচন করেছিল, যে সংকট ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদের ভঙ্গুর অবস্থা প্রকাশ্যে নিয়ে আসে।
১৯৫৬ সালে মিসরের প্রেসিডেন্ট জামাল আবদেল নাসের সুয়েজ খাল জাতীয়করণ করেন। এটি দীর্ঘ সময় ধরে ব্রিটিশ-ফরাসি কনসোর্টিয়ামের নিয়ন্ত্রণে ছিল এবং বিশ্ববাণিজ্য ও তেল পরিবহনে এক গুরুত্বপূর্ণ ধমনির মতো কাজ করছিল। তাই মিসরের পদক্ষেপ লন্ডন ও প্যারিসের কাছে গ্রহণযোগ্য ছিল না।
তৎকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী অ্যান্টনি ইডেন গোপনে ফ্রান্স ও ইসরায়েলের সঙ্গে সুয়েজ খাল দখলে একটি সমন্বিত পরিকল্পনা করেন। পরিকল্পনা ছিল, ইসরায়েল মিসর আক্রমণ করবে, আর অ্যাংলো-ফরাসি বাহিনী ‘যুদ্ধবিরতি নিশ্চিত ও শৃঙ্খলা পুনঃস্থাপন’ করার অজুহাতে হস্তক্ষেপ করবে।
কিন্তু তাদের সেই অভিযান দ্রুতই ব্যর্থ হয়। মার্কিন গোয়েন্দারা আগেই এ পরিকল্পনার খবর জানতে পারেন এবং প্রেসিডেন্ট আইজেনহাওয়ার এটি সমর্থন করতে অস্বীকার জানান।
কারণ, আইজেনহাওয়ার এটিকে একটি নতুন উপনিবেশবাদী বেপরোয়া হস্তক্ষেপ বলে মনে করেছিলেন, যা নতুন স্বাধীন হওয়া রাষ্ট্রগুলোকে সোভিয়েত ইউনিয়নের দিকে ঠেলে দিতে পারে।
মস্কো মিসরকে সমর্থন দিয়ে তার পাশে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিলে সংকট দুই পরাশক্তির সংঘর্ষে রূপ নেওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে। যুক্তরাষ্ট্র সেই ঝুঁকি নিতে চায়নি।
ওয়াশিংটন জাতিসংঘকে ব্যবহার করে অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও ইসরায়েলকে পিছিয়ে যেতে বাধ্য করে।
এ ঘটনা ওই অঞ্চলে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়। সেটি হলো, যুক্তরাজ্য বা অন্যান্য ইউরোপীয় দেশ নয়; বরং মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগত ভারসাম্য নির্ধারণ করবে যুক্তরাষ্ট্র।
যে যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে বিশৃঙ্খলার দ্বার উন্মুক্ত করে
২০০৩ সালে ইরাকে আক্রমণ যুক্তরাষ্ট্রের আরেক উচ্চাভিলাষী পরীক্ষা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রে নাইন–ইলেভেন হামলার পর তথাকথিত বৈশ্বিক সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ শুরু করে দেশটি। কিন্তু প্রাথমিক পর্যায়ে অনেক মার্কিন নীতিনির্ধারকের কাছে শুধু আফগানিস্তানে অভিযান যথেষ্ট মনে হচ্ছিল না।
সে সময় নানান নিষেধাজ্ঞা ও আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতার কারণে ইরাক ছিল অনেকটাই দুর্বল। যুক্তরাষ্ট্রের সামনে দেশটি একই সঙ্গে একটি হুমকি এবং একটি সুযোগ হিসেবে ধরা দেয়।
ইরাকে সামরিক অভিযানের পক্ষে জনমত তৈরি করতে তৎকালীন বুশ প্রশাসন যুক্তি দিয়েছিল, ইরাকের প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনের কাছে ব্যাপক বিধ্বংসী অস্ত্র আছে এবং তিনি সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন।
এ দাবি এমনভাবে প্রচার করা হয়েছিল যে দেশে এবং আন্তর্জাতিকভাবে ইরাকে অভিযানের পক্ষে জনসমর্থন তৈরি করতে তা সহায়তা করেছিল।
ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের দ্রুত সামরিক জয়ের পর সে দেশে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিতিশীলতা দেখা দেয়। ইরাকের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো ধ্বংস ও সেনাবাহিনী বিলুপ্ত করার কারণে নিরাপত্তাশূন্যতা তৈরি হয়।
বিভিন্ন গোষ্ঠী বা সম্প্রদায়ভিত্তিক মিলিশিয়ারা ক্ষমতার দ্বন্দ্বে জড়িয় পড়েন, বিদ্রোহী তৎপরতা শুরু হয় এবং আত্মঘাতী বোমা হামলা সাধারণ ঘটনায় পরিণত হয়। সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো প্রতিশোধ, নির্যাতন এবং জাতিগত নির্মূল অভিযান চালায়।
এমন বিশৃঙ্খলার সুযোগে আল-কায়েদা (যুক্তরাষ্ট্রে নাইন–ইলেভেন হামলায় অভিযুক্ত সশস্ত্র গোষ্ঠী) ইরাকে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করে।
‘(মার্কিন) সামরিক অভিযানের এ ফলাফল একটি বৈপরীত্য তুলে ধরে। সেটি হলো, মার্কিন সামরিক অভিযান ইরাকের জন্য ধ্বংসাত্মক এবং এ অঞ্চলের জন্য অস্থিতিশীলতা তৈরি করলেও, দুর্বল রাষ্ট্রের ওপর ওয়াশিংটনের প্রভাব বাড়িয়েছিল’, বলেন সুকহভ।
এ দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে লিবিয়া এবং অন্যান্য দেশেও একই ধরনের প্রক্রিয়া লক্ষ করা যায়। তা হলো, মার্কিন অভিযানের কারণে সৃষ্ট অস্থিতিশীলতা মানবিক ও আঞ্চলিক দিক থেকে ব্যর্থতার পরিচায়ক হতে পারে, কিন্তু এই নিরাপত্তাশূন্যতা সেখানে বাইরের শক্তিকে হস্তক্ষেপ করতে কৌশলগত সুবিধা দেয়।
ওয়াশিংটনের পরবর্তী শত্রু লিবিয়া
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্য নীতির পরবর্তী ধাপে প্রতিপক্ষের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে যাওয়ার ইচ্ছার প্রকাশ ঘটতে থাকে। সেই ১৯৮০–এর দশকের শুরুতেই ওয়াশিংটন লিবিয়ার নেতা মুয়াম্মার গাদ্দাফিকে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টিকারী শক্তি হিসেবে চিহ্নিত করেছিল। কারণ, গাদ্দাফি শীতল যুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে আফ্রিকা ও ভূমধ্যসাগরে সোভিয়েত প্রভাবের সম্ভাব্য হাতিয়ার হয়ে উঠেছিলেন।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যান তাঁর দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই লিবিয়া থেকে গাদ্দাফিকে সরানোর বা তাঁকে দুর্বল করার উপায় খুঁজতে শুরু করেন।
১৯৮৬ সালে ‘গালফ অব সিদ্রা’য় (লিবিয়ার উত্তরে মিসরাতা থেকে বেনগাজি পর্যন্ত প্রায় ৪৪৩ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে বিস্তৃত সির্ত উপসাগর) সংঘাত বৃদ্ধি পাওয়ার পর মার্কিন বাহিনী লিবিয়ার তল্লাশি নৌযানগুলো ডুবিয়ে দেয় এবং দেশটির উপকূলে নিজেদের সামরিক উপস্থিতি বৃদ্ধি করে।
সে সময় বার্লিনের একটি নৈশক্লাবে বোমা হামলায় দুই মার্কিন সেনা নিহত হন। ওয়াশিংটন এ জন্য লিবিয়ার গোয়েন্দা সংস্থাকে দায়ী করে ত্রিপোলি ও বেনগাজি শহরে বিমান হামলা চালায়। এ অভিযান শুধু লিবিয়াকে শাস্তি দেওয়ার উদ্দেশ্যেই নয়; বরং গাদ্দাফিকে অপসারণ বা তাঁর শাসনব্যবস্থাকে অস্থিতিশীল করে তোলার লক্ষ্যেও ছিল বলে উল্লেখ করা হয়।
সেবার গাদ্দাফি বেঁচে যান ও নিজেদের বিজয়ের ঘোষণা দেন। তবে এ সংঘাত এক গুরুত্বপূর্ণ মোড় সূচিত করে। পরবর্তী দশকে লিবিয়া কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতা ও নিষেধাজ্ঞার মুখোমুখি হয়।
যদিও চলতি শতাব্দীর শুরুর দশকে গাদ্দাফি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক পুনরুদ্ধার ও দেশকে আবার অর্থনৈতিক উন্নতির দিকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা শুরু করেছিলেন। তিনি অস্ত্র কর্মসূচি ত্যাগ করেন, পশ্চিমা সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত করেন এবং বিদেশি শক্তি ও জ্বালানি কোম্পানিগুলোকে তাঁর দেশে ফিরে আসার সুযোগ দেন।
তবে ২০১১ সালের শুরুতে শুরু হওয়া আরব বসন্তের (ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে গণ–বিক্ষোভ, যা শুরু হয়েছিল তিউনিসিয়া থেকে) ধাক্কা লিবিয়াতেও লাগে। লিবিয়ায় বিক্ষোভ সশস্ত্র বিদ্রোহে রূপ নেয়। সরকারি বাহিনী সহিংস প্রতিক্রিয়া দেখায়। ফলে লিবিয়ার ওপর আরও নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক নিন্দা শুরু হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটো গাদ্দাফি বিরোধী বাহিনীর পক্ষ নিয়ে বিমান হামলার মাধ্যমে হস্তক্ষেপ করে, যা দেশটিতে ক্ষমতার ভারসাম্য পরিবর্তন করে।
২০১১ সালের আগস্টের মধ্যে, বিদ্রোহীরা ত্রিপোলি দখল করে। গাদ্দাফি পালিয়ে যান, কিন্তু দুই মাস পর তিনি ধরা পড়েন এবং তাঁকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়।
এর মাধ্যমে লিবিয়ায় গাদ্দাফির চার দশকের শাসনের অবসান ঘটলেও এখন পর্যন্ত দেশটিতে স্থিতিশীলতা ফেরেনি।
তবে দীর্ঘ কয়েক বছরের অস্থিতিশীলতার পর লিবিয়ার জ্বালানি খাতে ধীরে ধীরে বিদেশি বিনিয়োগের দ্বার খুলছে।
চলতি বছরের জানুয়ারির শুরুতে, শেভরনের নেতৃত্বে মার্কিন কোম্পানিগুলো লিবিয়ায় তেল ও গ্যাস সম্পদ উন্নয়নের অনুমোদন (লাইসেন্স) পেয়েছে।
শাসন পরিবর্তন থেকে অনন্ত সংঘাত: সিরিয়া
আরব বসন্তের সবচেয়ে বিধ্বংসী পরিণতির একটি হয়ে ওঠে সিরিয়ার সংঘাত। সরকারবিরোধী বিক্ষোভে প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদ কঠোর বলপ্রয়োগ করেন এবং ক্ষমতা ধরে রাখতে রাশিয়া ও ইরানের সমর্থনের ওপর নির্ভর করেন।
২০১১ সালে সিরিয়ায় গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। ২০১৩ সালে ওয়াশিংটন সরাসরি সামরিক পদক্ষেপে না গিয়ে গোপনে হস্তক্ষেপের নীতি গ্রহণ করে।
সিআইএ গোপন প্রকল্পের মাধ্যমে সিরিয়ার বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোকে সমর্থন দেয়।
সিরিয়া যুদ্ধ দ্রুত ধারণার চেয়ে অনেক বেশি ছড়িয়ে পড়ে। সশস্ত্র গোষ্ঠী ইসলামিক স্টেটের (আইএস) উত্থান ঘটে। আইএস সিরিয়া ও ইরাকে বিশাল অঞ্চল দখল করে নেয়।
বছরের পর বছর ধরে সিরিয়ায় গৃহযুদ্ধ চলতে থাকে। যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে বিভিন্ন গোষ্ঠী। দীর্ঘ ১৩ বছর গৃহযুদ্ধ চলার পর ২০২৪ সালের ডিসেম্বর মাসে আহমেদ আল–শারার নেতৃত্বে বিদ্রোহীদের ঝোড়ো আক্রমণের মুখে স্বৈরশাসক বাশার আল–আসাদ পালিয়ে রাশিয়া যান।
সিরিয়ায় এখন ক্ষমতায় আহমেদ আল-শারার অন্তর্বর্তী সরকার। আল–কায়েদার সাবেক সদস্য আল–শারাকে যুক্তরাষ্ট্র একসময় সন্ত্রাসীদের তালিকাভুক্ত করেছিল। তবে এখন তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টা করছেন।
সিরিয়া যুদ্ধ দেখিয়েছে কীভাবে মার্কিন হস্তক্ষেপ, প্রক্সি যুদ্ধ (বিভিন্ন বিদ্রোহী গোষ্ঠীকে সহায়তা–সমর্থন) শেষ পর্যন্ত ওয়াশিংটনের প্রাথমিক লক্ষ্যের সম্পূর্ণ ভিন্ন ফলাফলও এনে দিতে পারে।
মস্কোর এইচএসই বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক নিকোলাই সুকহভ বলেন, ‘বিংশ শতাব্দীতে মার্কিন হস্তক্ষেপ প্রায়শ সরকার পরিবর্তন এবং পশ্চিমা কোম্পানির জন্য সরাসরি তেলক্ষেত্রের প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে পরিচালিত হতো। তবে ২১ শতকে এসে ওয়াশিংটন ভিন্ন ধরনের প্রভাব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চালাচ্ছে, যেমনটা ভেনেজুয়েলায় ঘটেছে।
যুক্তরাষ্ট্র নিজেকে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থার মধ্যস্থতাকারী হিসেবে দেখাতে চাইছে। সেই সঙ্গে চাইছে, জ্বালানি পরিবহনের পথ ও বাজার নিয়ন্ত্রণ এবং মুনাফা আদায় ও জ্বালানি প্রবাহকে নিজেদের কৌশলগত স্বার্থে ব্যবহার করতে।
তথ্যসূত্র: আরটি