শত অনিশ্চয়তা ও প্রতিকূলতা কাটিয়ে বহুল প্রত্যাশিত ঐতিহাসিক ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন মোটামুটি শান্তিপূর্ণ হয়েছে। ভোটের হারও মোটামুটি ভালো ছিল। তবে ভোট দিলেও আসলে কতটা বাস্তব পরিবর্তন বা লাভ পাওয়া যাবে, তা নিয়ে অতীত অভিজ্ঞতার কারণে অনেকের মনে সন্দেহ রয়ে গেছে। এই আস্থার ঘাটতির কারণেই হয়তো ভোটের হার আরও বেশি হয়নি। তবে মোটের ওপর নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়েছে।
কর্তৃত্বপরায়ণ ক্লিপ্টোক্রেসি বা তস্করতন্ত্রের পরাজয়ের পর অন্তর্বর্তী সরকার আওয়ামী লীগের কার্যক্রম ও ছাত্রলীগকে নিষিদ্ধ করে। এতে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ হারায়। ফলে দেশে-বিদেশে অনেকেই এ নির্বাচন কতটুকু অন্তর্ভুক্তিমূলক হলো, সে প্রশ্ন তুলতে পারেন। তবে মনে রাখতে হবে, জুলাই অভ্যুত্থান ও অন্তর্বর্তী সরকারকে অবৈধ ও ষড়যন্ত্রমূলক ঘোষণার অবস্থানে আওয়ামী লীগ অবিচল থেকেছে। তারা নির্বাচনকেও অবৈধ ও প্রতিহত করার ঘোষণা দিয়েছে। এ লক্ষ্যে তারা নির্বাচনকালে সক্রিয় ছিল। অতএব নির্বাচন ও নির্বাচনী পরিবেশে আওয়ামী লীগের নেতিবাচক ও সক্রিয় ভূমিকা অস্বীকার করার উপায় নেই।
তবে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে নির্বাচন প্রতিহত করার অবস্থান সত্ত্বেও মাঠপর্যায়ে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী-সমর্থকেরা নির্বাচনে ভোটার হিসেবে অংশ নিয়েছেন। এমনকি কারাগারে থাকা দলটির উচ্চপর্যায়ের নেতারাও ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন। দলটির সমর্থকদের একাংশ ভোট বর্জন করে থাকতে পারেন, কিন্তু সেটি তো সাধারণ ভোটারদের ক্ষেত্রেও কমবেশি প্রযোজ্য।
মাঠপর্যায়ে আওয়ামী লীগের ভোট টানার জন্য নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী দলের অনেকেই, বিশেষ করে বিএনপি ও জামায়াত জোট এবং জাতীয় পার্টিসহ বিভিন্ন দল ও প্রার্থীদের মধ্যে প্রতিযোগিতা হয়েছে। এতে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরাও সাড়া দিয়েছেন। অনেক ক্ষেত্রে তাঁরা নির্বাচনে সরাসরি অংশগ্রহণকারী কোনো কোনো দলে যোগদান করেছেন ও প্রচারণাসহ সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণও করেছেন।
ফলে আওয়ামী লীগ একদিকে দল হিসেবে নির্বাচনে আনুষ্ঠানিকভাবে নেতিবাচক ভূমিকা রেখেছে; অন্যদিকে অনানুষ্ঠানিকভাবে দলটির নেতা-কর্মী-সমর্থকেরা ভোট দেওয়াসহ তাঁদের রাজনৈতিক অধিকার প্রয়োগ করেছেন। তাই নির্বাচন অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়নি—এমন অবস্থানের পক্ষে গ্রহণযোগ্য যুক্তি খুঁজে পাওয়া কঠিন।
বাস্তবতার নিরিখে সব ভোটার সম-অধিকারের ভিত্তিতে ভোট দিতে পেরেছেন, এমনও বলা যাবে না। বাস্তবতা হলো, সব ভোটার সমানভাবে ভোট দিতে পারেননি। এখানে ধনসম্পদ ও পেশিশক্তির প্রভাব বড় ভূমিকা রেখেছে। সেই সঙ্গে রাজনৈতিক ও নির্বাচনী পরিবেশে ধর্মান্ধতা, ধর্মের ভুল ব্যাখ্যা, পুরুষতান্ত্রিক মনোভাব এবং সংখ্যাগরিষ্ঠদের চাপও ছিল। এই কারণে সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে নারী, সংখ্যালঘু, প্রতিবন্ধী এবং প্রান্তিক ভোটারদের জন্য পরিবেশ বিভ্রান্তিকর হয়ে উঠেছে। অনেক সময় এটা কঠিন বা ভয়ংকরও হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তারপরও, এবার নির্বাচন জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্যভাবে সম্পন্ন হয়েছে এবং জনগণের রায়ে নতুন সংসদ ও সরকার গঠিত হতে যাচ্ছে। সংসদে বিএনপি জোটের দুই-তৃতীয়াংশের বেশি সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকবে, যা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে আমরা জানি, এই ধরনের সংখ্যাগরিষ্ঠতার নেতিবাচক প্রভাব কত বড় হতে পারে—এ অভিজ্ঞতা আছে জনগণের এবং বর্তমান সব রাজনৈতিক দলেরও।
এই শিক্ষা মাথায় রেখে আশা করা যায় যে নতুন সংসদ ও সরকার দায়িত্বশীলভাবে কাজ করবে এবং ‘এবার আমাদের পালা’ মনোভাব পরিহার করবে। এটি দেশের সাধারণ জনগণের প্রত্যাশা।
বিএনপির বড় বিজয়ের ঝুঁকির দিক থাকলেও, এবার দেশের ভোটাররা এমন একটি পরিস্থিতি ঠেকাতে পেরেছেন, যা আরও ভয়ংকর হতে পারত। এই গুরুত্বপূর্ণ দিকটি হলো দেশের রাজনৈতিক পরিবেশে ধর্মান্ধ বা ধর্মের ভুল ব্যাখ্যার ওপর ভিত্তি করে আগ্রাসীভাবে কোনো শক্তির বিস্তারের চেষ্টা সীমিত হয়েছে, অন্তত সাময়িকভাবে।
ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহার রোধ করাই ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের অন্যতম চাওয়া। সেই বিবেচনায় এবারের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলের এক-চতুর্থাংশের বেশি আসন পাওয়া হতাশাজনক। কিন্তু এটাই বাস্তবতা। একে শুধু জুলাই আন্দোলনের ফল হিসেবে দেখলে হবে না। স্বাধীনতা–পরবর্তী সময়ে ক্ষমতার রাজনীতিতে রাজনৈতিক দলগুলো ধর্মীয় প্রভাব বাড়ানোর জন্য একধরনের অসুস্থ প্রতিযোগিতায় লিপ্ত থাকায় এই ধরনের শক্তি গড়ে ওঠার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
এর ধারাবাহিকতায় নব্বইয়ের পর থেকে দেশের দুই বড় রাজনৈতিক দল একে অপরের ওপর ‘উইনার টেকস অল’ বা ‘বিজয়ীরা সব নিয়ে যাবে’ মানসিকতায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা চালাচ্ছে। এই প্রতিযোগিতার অংশ হিসেবে ধর্মভিত্তিক শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক গড়ার ক্ষেত্রে কোনো সীমাবদ্ধতা বা নিয়ম ছিল না। এবারের নির্বাচনের কিছু ঘটনার মধ্যেও এর নমুনা দেখা গেছে।
এ শক্তি শুধু কর্তৃত্ববাদবিরোধী গণ-আন্দোলনের অংশ ছিল না; বরং কর্তৃত্ববাদ পতনের পরে অতি ক্ষমতাপ্রবণ অবস্থায় নিজের অবস্থান আরও শক্ত করেছে। নারী কমিশনের প্রতিবেদন নিয়ে বা মাজার ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের ওপর এই ধর্মীয় চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলোর আক্রমণাত্মক কর্মকাণ্ডের সময় অন্তর্বর্তী সরকারের
নীরব ও আত্মসমর্পণমূলক আচরণ এ শক্তিকে আরও ক্ষমতাবান করেছে।
অন্যদিকে ইসলামের প্রতি পশ্চিমা বিশ্বের ক্রমবর্ধমান নেতিবাচক মনোভাব এবং পার্শ্ববর্তী দেশের উগ্র হিন্দুত্ববাদী সরকারের ইসলামবিরোধী প্রচারণার কারণে একধরনের হুমকির অনুভূতি তৈরি হয়। এসব ঘটনা বাংলাদেশে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির বিকাশের পথ আরও প্রশস্ত করেছে।
তা ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি কৌশলভিত্তিক রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে জামায়াত সাংগঠনিক সক্ষমতা বাড়িয়েছে। পাশাপাশি তারা শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা, প্রশাসন, সিভিল-মিলিটারি আমলাতন্ত্র, ব্যাংক, আর্থিক খাতসহ রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, প্রাতিষ্ঠানিক ইকোসিস্টেমে নিজেদের ভিত্তি শক্তিশালী করতে পেরেছে। দেশের মূলধারার রাজনীতি ধারাবাহিকভাবে দেশের জনপ্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হওয়ায় ধর্মভিত্তিক রাজনীতি ‘বিকল্প’ হিসেবে নিজেদের উপস্থাপনের সুযোগ পেয়েছে।
অতএব টেকসই ভিত্তির ওপর বিকশিত জামায়াতের এ নির্বাচনী উত্থান সাময়িক কোনো বিষয় নয়। একই সঙ্গে তাদের এ অভূতপূর্ব অর্জন পরবর্তী সময়ে আরও কত বিকশিত হবে, তা নির্ভর করবে বড় জয় নিয়ে ক্ষমতায় যাওয়ার পর বিএনপি কীভাবে দেশ পরিচালনা করবে তার ওপর।
বিএনপি ‘রাষ্ট্রকাঠামো মেরামতের ৩১ দফা’, এবারের নির্বাচনের ইশতেহার এবং জুলাই সনদে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। তার ভিত্তিতে তারা নতুন সরকারে এসে কীভাবে দায়িত্ব পালন করবে, কতটা সফল হবে এবং তার সুবিধা জনগণ কখন, কতটা ও কীভাবে পাবে—এগুলো গুরুত্বপূর্ণ। নতুন সরকার এসব ক্ষেত্রে সফল হতে না পারলে তা জামায়াতকে আরও শক্তিশালী হওয়ার সুযোগ দেবে।
বিশেষ করে রক্তের বিনিময়ে অর্জিত রাষ্ট্র সংস্কারের মূল লক্ষ্য হলো সরকার জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য থাকবে। এই উদ্দেশ্য পূরণের জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব থাকলেও বিএনপি সেগুলোতে ‘সরকারের হাত-পা বাঁধা যাবে না’ বলে নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছে। এই প্রস্তাবগুলো বর্তমান পরিস্থিতিতে কতটা যৌক্তিক আর বাস্তবে এগুলো কতটা বিপর্যয় বা বুমেরাং হিসেবে কাজ করতে পারে, তা দলকে নতুন করে বিচার-বিশ্লেষণ করতে হবে।
অর্থাৎ বিএনপিকে ভাবতে হবে, এগুলো সরকারের কার্যক্রমে কী প্রভাব ফেলতে পারে এবং কীভাবে এগুলো জনগণ বা রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার ওপর প্রভাব বিস্তার করতে পারে। সর্বোপরি রাজনৈতিক, জনপ্রতিনিধিত্ব ও সরকারি অবস্থানকে ক্ষমতার অপব্যবহারের লাইসেন্স হিসেবে বিবেচনা করার যে চর্চা দীর্ঘকাল ধরে চলে আসছে, তা থেকে মুক্তির জন্য আত্মশুদ্ধির পথ অবলম্বন করা ছাড়া বিকল্প নেই।
মনে রাখতে হবে, যেসব কারণে এবার জনগণের রায় জামায়াতকে আরও বেশি পথ যেতে দিল না, সেসব কারণ শনাক্ত করা এবং কীভাবে নিজেদের জনগণের কাছে আরও গ্রহণযোগ্য করা যায়, তার বিশ্লেষণে দলটি হয়তো অবিলম্বেই ‘ড্রয়িং বোর্ডে’ ফিরে যাবে। এই বিশ্লেষণের জন্য তারা হয়তো নতুন পরিকল্পনা বা কৌশল সাজাতে মনোযোগী হবে।
** ইফতেখারুজ্জামান ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক
প্রথম আলো থেকে নেয়া