বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর উচ্চ পর্যায়ের এক কর্মকর্তার সাম্প্রতিক ভারত সফরকে প্রতিবেশী দুই দেশের শীতল সম্পর্ক আবার স্বাভাবিকের ক্ষেত্রে নতুন পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
এ বিষয়ে জানেন ভারতের এমন কর্মকর্তাদের বরাতে দেশটির অনলাইন সংবাদমাধ্যম দ্য প্রিন্ট-এর এক প্রতিবেদন বলছে, চব্বিশের আন্দোলনে বাংলাদেশে শেখ হাসিনা সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর এটিই এ ধরনের প্রথম বৈঠক।
গত দেড় বছরের বেশি সময় ধরে দুই দেশের মধ্যে স্থগিত থাকা যোগাযোগের চ্যানেলগুলো পুনরায় চালুর বিষয়েও বৈঠকে আলোচনা হওয়ার কথা সংশ্লিষ্টদের বরাতে বলেছে দ্য প্রিন্ট।
এ প্রতিবেদনে বলা হয়, ঢাকায় নতুন সরকার ক্ষমতা গ্রহণের কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের (ডিজিএফআই) প্রধান মেজর জেনারেল মোহাম্মদ কায়সার রশিদ চৌধুরী নয়া দিল্লি সফর করেন। এসময় তিনি রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালিসিস উইং (র) এর প্রধান পরাগ জৈনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।
এর দিন কয়েক আগেই বাংলাদেশে গোয়েন্দা সংস্থাটির মহাপরিচালকের দায়িত্বে আসা কায়সার রশিদ সফরকালে ভারতীয় সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার মহাপরিচালক লেফটেন্যান্ট জেনারেল আর. এস. রামানসহ অন্যদের সঙ্গেও বৈঠক করেন।
দ্য প্রিন্ট বলছে, সংবাদমাধ্যমের কাছে গোপন রাখা ডিজিএফআই প্রধানের সফরে হওয়া এমন বৈঠক চব্বিশের গণ আন্দোলনে শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর এটিই প্রথম।
ছাত্র-জনতার প্রবল আন্দোলনের মুখে ২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট ভারতে চলে যান শেখ হাসিনা। তখন থেকে তিনি নয়া দিল্লিতেই অবস্থান করছেন। তার সরকারের পতনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসা মোহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে তখন থেকে ভারতের টানাপোড়েন চলছে। শেখ হাসিনা ফেরত চেয়ে প্রথম থেকেই বিচারের মুখোমুখি করতে চেয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠিও দিয়েছে। তবে এ বিষয়ে ভারত কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। এ নিয়ে দুই দেশের সরকারের মধ্যে সম্পর্ক শীতল হয়েছে। বিক্ষোভ, পাল্টা বিক্ষোভসহ নানা ঘটনার পরম্পরায় একই দিনে পাল্টাপাল্টি হাই কমিশনার তলবের মত ঘটনাও ঘটেছে।
প্রতিবেশী দুই দেশের মধ্যে বাড়তে থাকা এ দূরত্বের মধ্যে গত কয়েকমাসে বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার একাধিক বার্তা দেয় নরেন্দ্র মোদী সরকার। বিএনপির তরফেও ইতিবাচক হওয়ার আভাস দেওয়া হয়।
এমন প্রেক্ষাপটে বিএনপি সরকার দায়িত্বে আসার কয়েক সপ্তাহের মধ্যে নতুন ডিজিএফআই প্রধান মেজর জেনারেল কায়সার রশিদ চৌধুরী ভারত সফরে যান।
বিষয়টি সম্পর্কে অবগত ব্যক্তিদের বরাতে প্রিন্টের প্রতিবেদনে বলা হয়, ডিজিএফআই প্রধান ভারতের ওই দুই কর্মকর্তার সঙ্গে বৈঠক করেন। তারা এ বিষয়ে একটি বোঝাপড়ায় পৌঁছান যে, এমন কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী যাতে কোনো দেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করতে না পারে যাদের স্বার্থ ‘অন্য দেশের জন্য ক্ষতিকর’ তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি গত দেড় বছরের বেশি সময় ধরে স্থগিত থাকা যোগাযোগের চ্যানেলগুলো পুনরায় চালু করার বিষয়েও আলোচনা হয়।
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয়ের মাধ্যমে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার ১৭ ফেব্রুয়ারি শপথ নেয়। সপ্তাহ খানেকের মধ্যে সেনাবাহিনীর শীর্ষ পর্যায়ে রদবদলের অংশ হিসেবে ২৩ ফেব্রুয়ারি কায়সার রশিদকে ডিজিএফআই প্রধান হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়। এর ফলে তার সফরটি ঢাকা থেকে নয়া দিল্লিতে নতুন সরকারের পক্ষ থেকে প্রথম গুরুত্বপূর্ণ সফর হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে বলে প্রিন্টের প্রতিবেদনে বলা হয়।
দ্য প্রিন্ট বলছে, শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর থেকে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে বেশ কিছু যোগাযোগের চ্যানেল স্থগিত ছিল। তারেক রহমান দায়িত্ব নেওয়ার আগ পর্যন্ত দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগ মূলত জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টাদের (এনএসএ) কার্যালয়ের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছিল।
বাংলাদেশের সাবেক জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের মন্ত্রিসভায় রয়েছেন; যা নতুন প্রধানমন্ত্রীর অধীনে পররাষ্ট্রনীতির ধারাবাহিকতার আভাস দিচ্ছে। আগের বছর জুড়ে খলিলুর রহমান এবং ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল যোগাযোগ বজায় রেখেছিলেন, যদিও ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময় নয়া দিল্লি ও ঢাকার মধ্যে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্কের অবনতি ঘটে।
সোমবার প্রকাশিত প্রিন্টের প্রতিবেদনে বলা হয়, ডিজিএফআই প্রধান কায়সারের ভারত সফর আনুষ্ঠানিকভাবে ‘চিকিৎসাজনিত কারণে’ বলা হলেও বাংলাদেশ নিয়ে নয়া দিল্লির নিরাপত্তা উদ্বেগের প্রেক্ষাপটে তা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ভারত আশঙ্কা করছে, বাংলাদেশে সহিংসতা বাড়লে তা ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর শান্তি ও স্থিতিশীলতার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
ভারত গত কয়েক মাসে ইঙ্গিত দিয়েছে তারা তারেক রহমানের বিএনপির সঙ্গে কাজ করতে এবং সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে আগ্রহী।
ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস. জয়শঙ্কর বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া মারা যাওয়ার পর ঢাকায় যান। ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর তিনি প্রয়াতের বড় ছেলে তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে শোক জানান এবং প্রায় আধা ঘণ্টা বৈঠক করেন। ওই সময় তিনি নয়া দিল্লি থেকে পাঠানো শোকবার্তাও তুলে দেন। তবে ঢাকায় কয়েক ঘণ্টা অবস্থানকালে ওই সময় তিনি অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেননি।
ফেব্রুয়ারিতে তারেক রহমানের শপথ অনুষ্ঠানে ভারতের লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা এবং পররাষ্ট্র সচিব বিক্রম মিসরিকে পাঠায় নয়া দিল্লি। মুহাম্মদ ইউনুসের অন্তর্বর্তী সরকারের সময় টানাপোড়েনে পড়া সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ইচ্ছার আরেকটি ইঙ্গিত হিসেবে এটিকে দেখা হয়।
প্রিন্ট বলছে, তবে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে এখনো বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে, যার মধ্যে ঢাকার নিজস্ব অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতিও রয়েছে। ভারত এখনো শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দিয়ে রেখেছে। চব্বিশের আন্দোলন দমনে সহিংসতায় মৃত্যুর দায়ে তার অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
তবে বিএনপির মহাসচিব এবং স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দ্য হিন্দুকে বলেছেন, শেখ হাসিনার ভাগ্য নিয়ে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ককে ‘জিম্মি’ করে রাখা হবে না।
দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে বেশ কিছু চুক্তি রয়েছে। যার মধ্যে চলতি বছর ডিসেম্বরে শেষ হতে যাওয়া ১৯৯৬ সালের ভারত-বাংলাদেশ গঙ্গা পানি চুক্তি উভয় পক্ষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এছাড়া গত এক বছরে দুই দেশই যে কয়েকটি অর্থনৈতিক বিধিনিষেধ আরোপ করেছে, সেগুলোও এখনো বহাল রয়েছে।
এমন প্রেক্ষাপটের মধ্যে ইনকিলাব মঞ্চের নেতা ওসমান শরীফ হাদির হত্যাকাণ্ডের মামলার প্রধান আসামি ফয়সাল করিম মাসুদ ও আলমগীর হোসেনকে রোববার গ্রেপ্তারের তথ্য দিয়েছে ভারত। এ দুইজনকে পশ্চিমবঙ্গ স্পেশাল টাস্ক ফোর্স (এসটিএফ) আটক করে। তাদের দেশে ফেরত নিতে বাংলাদেশ কূটনৈতিকভাবে ভারতের সঙ্গে যোগাযোগ করবে। এটিও দুদেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখবে বলে বাংলাদেশে ভাবা হচ্ছে।
হাদির মৃত্যুর ঘটনায় ২০২৫ সালেল শেষ দিকে বাংলাদেশে সহিংস বিক্ষোভ শুরু হয়েছিল, যেখানে বিক্ষোভকারীদের ক্ষোভের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল ভারত।
সূত্র: বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম