বহু বছর ধরে ওয়াশিংটন তেহরানের সঙ্গে সম্পর্ক পরিচালনা করেছে চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে। একের পর এক নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। উপসাগরে নৌবাহিনীর উপস্থিতি বাড়ানো হয়েছে। রাজনৈতিক ভাষ্যে ইরানকে এমন এক রাষ্ট্র হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে, যেটি অর্থনৈতিক চাপে শেষ পর্যন্ত নতি স্বীকার করবে। ধারণা ছিল, দীর্ঘমেয়াদি চাপ ইরানের ভেতরের স্থিতিশীলতা ভেঙে দেবে এবং ইরানকে শর্ত মেনে নিতে বাধ্য করবে। সেই প্রত্যাশা বাস্তবে পূরণ হয়নি।
যুক্তরাষ্ট্র যৌথ সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা বা পরমাণু চুক্তি থেকে সরে দাঁড়ালে হিসাব ছিল স্পষ্ট। কঠোর অর্থনৈতিক চাপ হয় ইরানের ভেতরের ঐক্য ভেঙে দেবে, নয়তো ওয়াশিংটনের শর্তে তাকে আবার আলোচনার টেবিলে ফিরতে বাধ্য করবে।
কিন্তু ইরান ভিন্ন পথ বেছে নেয়। তারা তাদের পরমাণু কর্মসূচিকে কৌশলগত সম্পদে পরিণত করে। পশ্চিমা বিশ্বের বাইরে কৌশলগত অংশীদারত্ব জোরদার করে। অভ্যন্তরীণ প্রতিরোধ কাঠামো শক্তিশালী করে। নিষেধাজ্ঞা সাধারণ মানুষের ওপর গভীর কষ্ট চাপিয়ে দিয়েছে, এতে সন্দেহ নেই। কিন্তু রাষ্ট্র ভেঙে পড়েনি। সরকার নতি স্বীকার করেনি।
অর্থনৈতিক যুদ্ধ দীর্ঘদিন চালালে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হওয়া রাষ্ট্র তখন বিকল্প পথ খুঁজতে শুরু করে। আর্থিক, কূটনৈতিক ও সামরিক সব ক্ষেত্রেই নতুন পথ তৈরি হয়। এতে নিষেধাজ্ঞা যে কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে থাকে, সেটিই বদলে যেতে থাকে।
পশ্চিমা নিরাপত্তা আলোচনায় ইরানের সঙ্গে যুক্ত আঞ্চলিক শক্তিগুলোকে প্রায়ই ‘প্রক্সি’ বলা হয়। এই শব্দ তাদের নিজস্ব রাজনৈতিক সত্তাকে আড়াল করে। অথচ হামাস, হিজবুল্লাহ বা আনসার-আল্লাহ নিজেদের সমাজের বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে উঠে এসেছে। দখল, আগ্রাসন, অবরোধ ও রাজনৈতিক বঞ্চনার ইতিহাস তাদের উঠে আসার পেছনে কাজ করেছে। তাদের সব কৌশলের সঙ্গে কেউ একমত হবেন কি না, সেটি প্রশ্ন নয়। গুরুত্বপূর্ণ হলো, এসব শক্তির সামাজিক ভিত্তি রয়েছে। তাদের বৈধতা ওয়াশিংটন বা ব্রাসেলসে নির্ধারিত হয় না।
ইতিহাসে শক্তিশালী রাষ্ট্র বা প্রভাবশালী পক্ষই সাধারণত ঠিক করে দেয়, কোন প্রতিপক্ষকে কী নামে ডাকা হবে। তারা কোনো গোষ্ঠীকে ‘সন্ত্রাসী’, ‘উগ্রপন্থী’ বা ‘প্রক্সি’ বললে সেই পরিচয়ই আন্তর্জাতিক আলোচনায় প্রতিষ্ঠা পায়। কিন্তু শুধু একটি শব্দ ব্যবহার করলেই নৈতিক উচ্চতা বা নৈতিক সঠিকতা স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় না।
ইরান এসব শক্তির সঙ্গে সম্পর্ককে কৌশলগতভাবে ব্যবহার করে। এর ফলে প্রতিরোধের ক্ষেত্র বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে যায়। সংঘাতকে একটি নির্দিষ্ট যুদ্ধক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। এটি প্রচলিত যুদ্ধ নয়। এটি ভৌগোলিক অবস্থান, জনসংখ্যা ও সামাজিক শিকড়ের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা এক নেটওয়ার্কভিত্তিক প্রতিরোধ কৌশল।
যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত আলোচনায় এখনো বিমানবাহী রণতরি, নজরদারি ব্যবস্থা ও জোট কাঠামোকে শক্তির প্রতীক হিসেবে তুলে ধরা হয়। এগুলো নিঃসন্দেহে শক্তিশালী। কিন্তু সাম্প্রতিক ইতিহাস দেখিয়েছে, প্রযুক্তিগত শ্রেষ্ঠত্ব সব সময় স্থায়ী রাজনৈতিক ফল দেয় না। ভিয়েতনাম, আফগানিস্তান ও ইরাকে বিপুল সামরিক শক্তি ব্যবহার করা হয়েছিল। কিন্তু কাগজে-কলমে ‘বিজয়’ দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক স্থিতি নিশ্চিত করতে পারেনি।
পশ্চিমা নীতিনির্ধারকেরা ন্যাটোকে ঐক্যের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরেন। কিন্তু ইউক্রেন যুদ্ধের দীর্ঘায়িত পরিস্থিতিতে জোটের ভেতরের চাপ ও মতভেদও প্রকাশ পেয়েছে। অর্থনৈতিক সংকট, অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিভাজন ও জ্বালানি উদ্বেগ সিদ্ধান্ত গ্রহণকে জটিল করে তুলেছে। কাগজে জোট আছে। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যে আরেকটি বড় যুদ্ধের জন্য রাজনৈতিক আগ্রহ এখন আর আগের মতো শক্তিশালী নয়।
যুক্তরাষ্ট্রের ডলার এখনো বৈশ্বিক অর্থব্যবস্থার কেন্দ্র। তবে ভূরাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে নিষেধাজ্ঞার পুনরাবৃত্ত ব্যবহার অনেক দেশকে বিকল্প ব্যবস্থা খুঁজতে উদ্বুদ্ধ করেছে। স্থানীয় মুদ্রায় দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বেড়েছে। ব্রিকসের মতো প্ল্যাটফর্মে বিকল্প লেনদেন পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা জোরদার হয়েছে। কয়েকটি নিষেধাজ্ঞাগ্রস্ত দেশ সোনা মজুত বাড়িয়েছে আর্থিক ঝুঁকি মোকাবিলায়। এটি ডলারের আকস্মিক পতন নয়। বরং ধীরে ধীরে পুনর্বিন্যাস। আর্থিক ক্ষমতা এখনো শক্তিশালী, কিন্তু আর প্রশ্নাতীত নয়। অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে অস্ত্র বানালে বিকল্প পথ তৈরি হবেই।
ইরান জানে, তার ভূগোল ও সম্পদ তাকে আলোচনায় কিছু কাঠামোগত শক্তি দেয়। যুক্তরাষ্ট্রও জানে, বৈশ্বিক বাজারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি অঞ্চল অস্থিতিশীল হলে তার প্রভাব দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বাইরেও ছড়িয়ে পড়ে। ইসরায়েলের নিরাপত্তাকাঠামো যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ও সামরিক সহায়তার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। সহায়তা প্যাকেজ, কূটনৈতিক সমর্থন ও গোয়েন্দা সহযোগিতা তার কৌশলগত ভিত্তির অংশ। ফলে আঞ্চলিক হিসাব-নিকাশেও এই সম্পর্ক প্রভাব ফেলে।
গাজায় সামরিক অভিযানে বিপুল ধ্বংসক্ষমতা দেখা গেছে। কিন্তু শক্তি প্রয়োগ চূড়ান্ত রাজনৈতিক সমাধান এনে দেয়নি। বোমাবর্ষণে প্রতিরোধ মুছে যায়নি। ধ্বংস সব সময় স্থায়ী নিরাপত্তা নিশ্চিত করে না। এই বাস্তবতা অঞ্চলে এমন ধারণা জোরদার করেছে যে রাজনৈতিক সমঝোতা ছাড়া সামরিক প্রাধান্য কেবল চক্রকে দীর্ঘায়িত করে। যুক্তরাষ্ট্র এখনো শক্তিশালী রাষ্ট্র। তার প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও জোটব্যবস্থা বিস্তৃত। ইরান অর্থনৈতিকভাবে সীমাবদ্ধ হলেও কৌশলগতভাবে টিকে আছে। কেউই পূর্ণ আধিপত্যের অবস্থানে নেই।
পরিবর্তন এসেছে একতরফা পদক্ষেপের সীমায়। চূড়ান্ত বিজয় ছাড়া চাপ প্রয়োগ নিজের সীমাবদ্ধতাও প্রকাশ করে। যখন সামরিক, আর্থিক ও কূটনৈতিক ঝুঁকি একসঙ্গে বাড়ে, তখন আলোচনা অপরিহার্য হয়ে ওঠে। ইরান চায় স্থিতিশীলতা, যাতে অর্থনীতি পুনর্গঠন ও অভ্যন্তরীণ চাপ মোকাবিলা করা যায়। যুদ্ধ তার স্বার্থে নয়। যুক্তরাষ্ট্রও চায় নিয়ন্ত্রণ, কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী আরেকটি সংঘাতে জড়িয়ে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষয় মেনে নিতে চায় না।
বর্তমান আলোচনা উভয় পক্ষের সীমাবদ্ধতার স্বীকৃতি। একসময় যে ধারণা ছিল, ওয়াশিংটন পরিণতি ছাড়াই শর্ত চাপিয়ে দিতে পারে, সেটি ক্ষীণ হয়েছে। তার জায়গায় এসেছে এমন এক বাস্তবতা, যেখানে শক্তি ছড়িয়ে আছে বিভিন্ন হাতে এবং সমাধানের পথ হয়ে উঠছে আলোচনা।
মিডল ইস্ট মনিটর থেকে নেয়া, অনুবাদ: প্রথম আলো