দক্ষিণ পারস গ্যাসক্ষেত্রে ইসরায়েলের সাম্প্রতিক হামলাটি ছিল একটি সুপরিকল্পিত পদক্ষেপ। এর লক্ষ্য ছিল মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার সরাসরি অংশগ্রহণ আরও গভীর করা এবং ইরানের সঙ্গে উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর সংঘাত উসকে দেওয়া। হামলার ঘোষণা দেওয়ার সময় ইসরায়েলি কর্মকর্তারা দাবি করেছিলেন যে এই অভিযান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমন্বয় করেই করা হয়েছে। কিন্তু এর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ডোনাল্ড ট্রাম্প ভিন্ন সুরে কথা বলতে শুরু করেন।
ট্রাম্প ইসরায়েলি হামলার বিষয়ে নিজের অজ্ঞতা প্রকাশ করেন। এসময় তিনি দ্বিতীয়বারের মতো ইসরায়েলের প্রতি অনুরোধ জানান, যেন তারা জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা বন্ধ রাখে। এর পরপরই বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু জরুরি সংবাদ সম্মেলন করে জানালেন যে ওই হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের কোনো ভূমিকা ছিল না।
এই পরস্পরবিরোধী বক্তব্য স্পষ্ট করে দেয়, এটি হয় ইসরায়েলের আরেকটি সাজানো মিথ্যা অথবা এটি দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়ার একটি নাটক। ট্রাম্প হয়তো এর মাধ্যমে উপসাগরীয় দেশগুলোকে বোঝাতে চেয়েছেন যে তিনি হামলার বিষয়ে জানতেন না। একই সঙ্গে যেন ইরানও পাল্টা হিসেবে ওই দেশগুলোর জ্বালানি অবকাঠামোয় আঘাত না হানে।
মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী বিশৃঙ্খলা জিইয়ে রাখা ইসরায়েলের পুরোনো ও সুদূরপ্রসারী কৌশল। এই পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে নেতানিয়াহু হরমুজ প্রণালিকে পাশ কাটিয়ে ইসরায়েলকে একটি বিকল্প জ্বালানি করিডর হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করছেন।
যুদ্ধের বিস্তার এবং আমেরিকান ঘাঁটি থাকা দেশগুলোতে ইরানের পাল্টা হামলা বিশ্বজুড়ে বড় ধরনের অর্থনৈতিক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। বিশ্ব অর্থনীতি এমন এক মন্দার মুখে পড়তে পারে, যা ১৯৭৩ সালের তেল সংকটের পরবর্তী পরিস্থিতির কথা মনে করিয়ে দেয়।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, নেতানিয়াহু সম্ভবত ট্রাম্পকে বোঝাতে চাইছেন যে এই যুদ্ধের গতিপথ তিনিই নিয়ন্ত্রণ করেন। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে মার্কিন মেরিন জাহাজ পাঠানোর ঘটনা ট্রাম্পের ক্ষমতার সীমাবদ্ধতাকেই প্রকট করে তুলেছে। বড় প্রশ্ন হলো, ট্রাম্প কীভাবে এই যুদ্ধের জালে আটকা পড়লেন? ট্রাম্প মূলত দুটি বিষয় দিয়ে চালিত হন। যার একটি হলো অর্থ এবং অন্যটি তাঁর প্রচণ্ড আত্মপ্রেম। প্রশংসা এবং স্তুতি দিয়েই ট্রাম্পকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। নেতানিয়াহু এই বিষয়টি দীর্ঘকাল ধরে সাফল্যের সঙ্গে ব্যবহার করে আসছেন।
নেতানিয়াহু এবং মার্কিন সিনেট সদস্য লিন্ডসে গ্রাহাম ট্রাম্পকে এটা বোঝাতে সফল হয়েছেন যে ইরানের নেতৃত্বকে নিশ্চিহ্ন করলে রাষ্ট্রটি ভেঙে পড়বে এবং তারা দ্রুত আত্মসমর্পণ করবে। এর ফলে কোনো কৌশলগত স্পষ্টতা ছাড়াই আমেরিকা একটি ভয়াবহ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ছে। নিজের পেশাদার সামরিক কমান্ডারদের পরামর্শ উপেক্ষা করে ট্রাম্প তাঁর উগ্রবাদী প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের অবিবেচক জেদকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন।
ট্রাম্প ও হেগসেথ একটি সাধারণ সত্য বুঝতে ব্যর্থ হয়েছেন যে শুধু সামরিক শক্তি দিয়ে যুদ্ধ জেতা সম্ভব নয়। এটি অভিজ্ঞ সমরনায়কদের চিন্তা নয়; বরং অপেশাদার রাজনীতিকদের অপরিপক্ব ভাবনা। অভিজ্ঞ জেনারেলরা জানেন যে শক্তি দিয়ে একটি লড়াই জেতা গেলেও একটি সুস্পষ্ট পরিকল্পনা ছাড়া শান্তি প্রতিষ্ঠা করা যায় না। সঠিক লক্ষ্যের সঙ্গে ক্ষমতার ভারসাম্য না থাকলে শক্তিশালী সামরিক তৎপরতাও কেবল দীর্ঘস্থায়ী পণ্ডশ্রম হিসেবেই ইতিহাসে স্থান পায়।
আমেরিকার জন্য হরমুজ প্রণালি ব্রিটেনের সুয়েজ খাল বিপর্যয়ের মতো হতে পারে। সুয়েজ খাল থেকে যেভাবে ব্রিটেনের প্রভাব খর্ব হতে শুরু করেছিল, হরমুজও আমেরিকার জন্য একই পরিণাম বয়ে আনতে পারে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন বিশ্বের এক–পঞ্চমাংশ তেল পরিবহন করা হয়। একজন দায়িত্বশীল নেতার এমন গুরুত্বপূর্ণ একটি রণক্ষেত্রে অপ্রস্তুত থাকার কোনো সুযোগ নেই। কিন্তু বর্তমান মার্কিন প্রশাসনের কার্যকলাপে কেবল বিভ্রান্তি এবং পরিস্থিতির পেছনে ছুটে চলার চেষ্টাই পরিলক্ষিত হচ্ছে।
ট্রাম্প নির্বাচনের আগে মধ্যপ্রাচ্যের ‘অন্তহীন যুদ্ধ’ শেষ করার এবং জ্বালানি তেলের দাম কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। অথচ এখন তাঁর কথাবার্তায় কোনো সামঞ্জস্য নেই। শুরুতে তিনি মার্কিন নৌবাহিনীকে দিয়ে তেল ট্যাংকার পাহারা দেওয়ার কথা বললেন। পরে ঝুঁকি দেখে তিনি তেল কোম্পানিগুলোকে ‘সাহস দেখিয়ে’ নিজেদের জোরে পথ চলতে বললেন।
যখন সেই কৌশল কাজ করল না, তখন তিনি ন্যাটোর মিত্রসহ বড় দেশগুলোকে অনুরোধ করলেন নিজেদের যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর জন্য। কিন্তু ব্রিটেন, ফ্রান্স, জার্মানি ও চীনের মতো দেশগুলো ট্রাম্পের এই প্রস্তাবে সরাসরি না বলে দিয়েছে। দেশগুলো তেলের জন্য মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরশীল হওয়া সত্ত্বেও অন্যের এজেন্ডা বাস্তবায়নের যুদ্ধে নামতে চায় না।
সবশেষে বলা যায়, হরমুজ প্রণালি ইরানের হাতের তুরুপের তাস। আন্তর্জাতিক নিয়ম লঙ্ঘন করে ইসরায়েল যে সংঘাতের উসকানি দিচ্ছে, আমেরিকা তাতে অন্ধের মতো জড়িয়ে পড়ছে। ইরাক যুদ্ধের মতোই এখন মার্কিন জাতীয় স্বার্থের চেয়ে ইসরায়েলের কৌশলগত প্রাধান্যই বড় হয়ে উঠেছে।
ইসরায়েল শুধু ইরানের পরমাণু সক্ষমতা ধ্বংস করতে চায় না; বরং তারা ইরানকে একটি ব্যর্থ রাষ্ট্র হিসেবে দেখতে চায়, যেন এই অঞ্চলে তাদের কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী না থাকে। একসময় হয়তো জর্জ ডব্লিউ বুশের মতো ট্রাম্পও উপলব্ধি করবেন যে তিনি এমন এক যুদ্ধে জড়িয়ে গেছেন, যার গন্তব্য তাঁর অজানা। আর অন্য দেশের হয়ে প্রক্সি যুদ্ধের জন্য আমেরিকাকে হয়তো অনেক বড় চড়া মূল্য দিতে হবে।
মিডল ইস্ট মনিটর, প্রথম আলো থেকে নেয়া
সৌদি আরবের
কাছে অত্যাধুনিক 'স্টেলথ' (রাডারে সহজে ধরা পড়ে না এমন) যুদ্ধবিমান বিক্রির সিদ্ধান্ত
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্য নীতিকে এক জটিল পরিস্থিতির মুখে ঠেলে দিয়েছে। এর ফলে আঞ্চলিক
প্রতিরোধ ক্ষমতা ব...
ইরানের
সাথে সংঘাতের সময় যুক্তরাষ্ট্র ডজন ডজন বিমান—যার মধ্যে অন্তত ৩০টি ‘এমকিউ-৯ রিপার’
ড্রোন হারিয়েছে। এছাড়া ইরানের হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবহৃত শত শত ভবন ও স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত
বা ধ্বংস হয়েছে।সোম...
গত পাঁচ বছরে দক্ষিণ
এশিয়ায় তরুণদের নেতৃত্বে ছয়টি সরকারবিরোধী ও
প্রচলিত রাজনৈতিক ব্যবস্থাবিরোধী গণ–আন্দোলন হয়েছে।এসব
আন্দোলন এই অঞ্চলের রাজনীতিকে
মৌলিকভাবে বদলে দিয়েছে। আন্দোলনগুলোর
মধ্যে অনেক মিল...
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের
শেষে বিশ্বের সবচেয়ে বড় নৌবাহিনী ছিল যুক্তরাষ্ট্রের। ১৯৭৫ সালেও দেশটি বিশ্বের অন্যতম
প্রধান জাহাজ নির্মাণকারী শক্তি। তবে তখনই তার আধিপত্যে ভাটা শুরু হয়েছিল। শতাব্দীর
শেষ দিকে সর...
সৌদি
আরব, তুরস্ক এবং পাকিস্তানের সঙ্গে
বাংলাদেশের সম্ভাব্য প্রতিরক্ষা চুক্তিতে প্রবেশ ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে ঢাকাকে নতুন সুবিধা দিতে
পারে। তবে পর্যবেক্ষকরা সতর্ক করেছেন এটা যুদ্ধবাজ নয়াদি...
এক মাস পর যুক্তরাষ্ট্র-ইরান
যুদ্ধের প্রথম হামলার পর, এই সপ্তাহে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই যুদ্ধে
একটি নতুন পর্যায়ের ইঙ্গিত দিয়েছেন বলে মনে হচ্ছে। গত শুক্রবার এই যুদ্ধ তার প্রথম
ছয় ম...
পররাষ্ট্রমন্ত্রী
খলিলুর রহমান বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) জাতীয় সংসদে সদস্যদের প্রশ্নোত্তরের জবাবে জানিয়েছেন
যে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের সমন্বয়ে
গঠিত মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিতে যোগ দেওয়ার আমন্ত্র...
প্রধানত
নারী ও মেয়েদের প্রতি
তাদের আচরণের কারণে তালেবানকে তর্কসাপেক্ষে বিশ্বের সবচেয়ে নৃশংস শাসনব্যবস্থা বলা যেতে পারে।
এই গোষ্ঠী সন্ত্রাসীদেরও আশ্রয় দেয় এবং এর
নেতারা নিষেধাজ্ঞার শিকার ও বিশ্...
কম বয়সী শিশুদের সামাজিক
যোগাযোগমাধ্যম থেকে দূরে রাখতে
বয়স যাচাইয়ের প্রযুক্তি থাকাসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কোম্পানিগুলো কীভাবে ব্যবসা পরিচালনা করবে...
বাংলাদেশের
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম চার দিনের সরকারি চীন সফরে বাণিজ্য ও সবুজ প্রযুক্তি
বিষয়ক বেশ কিছু চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে, যা প্রত্যা...