গত ১৮ অগস্ট থেকে ভারতের বিহার রাজ্যের রাজধানী পটনার গর্দানিবাগ এলাকায় বিক্ষোভ করছেন শিক্ষার্থীরা। বিহার পাবলিক সার্ভিস কমিশন (বিপিএসসি) পরীক্ষা বাতিলের দাবি, প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং অনিয়মের অভিযোগ তুলে শান্তিপূর্ণভাবেই কর্মসূচি পালন করা হচ্ছিল। মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) রাজভবন অভিযান ঘিরে অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতি তৈরি হয়। অভিযোগ, বিপিএসসির এগজ়ামিনেশন কন্ট্রোলারের সোমবার করা একটি মন্তব্যই বিক্ষোভের আগুনে ঘি ঢেলেছে। বিক্ষোভকারীদের একাংশের দাবি, তাঁদেরকুকুরবলা হয়েছে। আসরে নেমেছে লালুপ্রসাদ যাদবের দলও। কন্ট্রোলার দাবি করেন, তিনি কারও মনে আঘাত করতে চাননি।

তাতে ক্ষতের খুব একটা মেরামত হয়নি। মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) মুখ্যমন্ত্রীর বাসভবনের দিকে এগোনোর সময় ডাকবাংলো চকে পুলিশের সঙ্গে সংঘাতে জড়ায় প্রতিবাদীরা। গর্দানিবাগ থেকে মিছিল যখন সেখানে পৌঁছোয়, তখন পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়। অভিযোগ, পুলিশের দেওয়া ব্যারিকেড টপকানোর চেষ্টা করেন শিক্ষার্থীরা। তখন তাঁদের উপরে লাঠি চালানোর অভিযোগ উঠেছে পুলিশের বিরুদ্ধে। পরিস্থিতি সামাল দিতে ব্যবহার করা হয় জলকামান। কয়েক জন বিক্ষোভকারীকে আটক করা হয়েছে। জখম হয়েছেন পুলিশকর্মীরাও। এই বিক্ষোভের সময়ে এক ছাত্রী অসুস্থ হয়ে পড়েন। দিল্লির যন্তর মন্তরে সিজেপির কর্মসূচি, ঝাড়খণ্ডে বিক্ষোভের পরে উত্তপ্ত হয় পটনাও।

নেপথ্যে কারণ কী?

গত ১৮ অগস্ট বিপিএসসি ঘোষণা করে, বিহারে প্রাথমিক, উচ্চ প্রাথমিক, উচ্চ মাধ্যমিক স্কুলগুলিতে মোট ৩২ হাজার ৩৮৮টি শূন্যপদে নিয়োগ করা হবে। থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর আবেদন গ্রহণ করা হবে। ডিসেম্বর বা জানুয়ারিতে হবে পরীক্ষা। সেই দিনক্ষণ অক্টোবরে ঘোষণা করা হবে।

বিহারে টিচার রিক্রুটমেন্ট এগ্জ়ামিনেশন (টিআরই-)-এর নতুন পদ্ধতিও ঘোষণা করেছে বিপিএসসি। সেই নিয়েই শিক্ষার্থীদের মধ্যে তৈরি হয়েছে অসন্তোষ। কমিশন জানিয়েছে, দুটি পর্যায়ে এই নিয়োগ পরীক্ষা হবে। অবজেকটিভ পরীক্ষায় প্রশ্নের উত্তর ভুল লিখলে নম্বরও কাটা (নেগেটিভ মার্কিং) হবে। শিক্ষার্থীদের দাবি, টিআরই- পরীক্ষা একটি পর্যায়েই নিতে হবে। ভুল উত্তরে নম্বর কাটা চলবে না। তাঁদের অভিযোগ, পরীক্ষার যে পদ্ধতি কমিশন ঘোষণা করেছে, তা বিতর্কিত। শিক্ষার্থীদের আরও দাবি, ৭০তম বিপিএসসির প্রিলিমিনারি পরীক্ষা বাতিল করতে হবে। অভিযোগ, ওই পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে। কিছু অনিয়মও হয়েছে।

শিক্ষার্থীদের দাবি মানতে অস্বীকার করেছে বিপিএসসি। তারা জানিয়েছে, সমাজমাধ্যমে প্রশ্নপত্র বলে যা প্রকাশ করা হয়েছিল, তাভুয়ো হিন্দি মাধ্যমের শিক্ষার্থীরা বৈষম্যের শিকার হয়েছেন বলে যে অভিযোগ প্রতিবাদীরা তুলেছেন, তা- অস্বীকার করেছে বিপিএসসি।

প্রতিবাদীদের অন্যতম দাবি হল, বিহারে সরকারি চাকরিতে ১০০ শতাংশ শূন্যপদে বিহারের বাসিন্দাদেরই নিয়োগ করতে হবে। ভিন্রাজ্যের বাসিন্দাদের নিয়োগ করলে চলবে না। বিপিএসসির দাবি, এই নিয়ে তারা সিদ্ধান্ত নিতে পারবে না। এই সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা রয়েছে রাজ্য সরকারের হাতে। বিপিএসসি পরীক্ষায় যাঁরা বসেন, তাঁদের ৭২ শতাংশই বিহারের বাসিন্দা বলেও জানানো হয়েছে। শিক্ষার্থীরা পরীক্ষার্থীদের বয়সের ঊর্ধ্বসীমায় ছাড় দেওয়ার দাবিও তুলেছে।

সোমবার পুলিশ সুপার, জেলাশাসক, শিক্ষা দফতরের শীর্ষ আধিকারিকদের সঙ্গে দেখা করে প্রতিবাদীদের একটি প্রতিনিধিদল। ছাত্রনেতা দিলীপ কুমার জানান, তারা মুখ্যমন্ত্রী সম্রাট চৌধরী মুখ্যসচিবের সঙ্গে দেখা করতে চেয়েছিল। কিন্তু তাদের শিক্ষাসচিবের সঙ্গে দেখা করতে বলা হয়। টিআরই--এক পাঠ্যক্রমে বদল নিয়ে কিছু প্রস্তাবও প্রতিনিধিদের দেয় শিক্ষা দফতর। এক ছাত্রনেতা জানিয়েছেন, সেই নিয়ে প্রতিবাদীরা আলোচনা করবেন।

সেই বৈঠকের পরে সাংবাদিক বৈঠকে বিপিএসসি- এগজ়ামিনেশন কন্ট্রোলার রাজেশকুমার সিংহকে বিক্ষোভ নিয়ে প্রশ্ন করা হয়। জবাবে তিনি হিন্দি উদ্ধৃতির ব্যবহার করে বলেন, ‘‘হাতি চলে বাজার, কুত্তা ভোকে হাজার (যারা লক্ষ্যপূরণ করতে চায়, তাদের সমালোচনায় কান দেওয়া উচিত নয়)’’

সেই বক্তব্যের পরেই ক্ষোভ প্রকাশ করেন প্রতিবাদীরা। রাজেশ দাবি করেন, তাঁর বক্তব্যের ভুল ব্যাখ্যা করা হয়েছে। তিনি কাউকে আঘাত করতে চাননি। কেউ দুঃখ পেলে তিনি ক্ষমাপ্রার্থী। তবে তত ক্ষণে যা হওয়ার, হয়ে গিয়েছে। তাঁকে ক্ষমা চাইতে হবে বলে দাবি করেন আরজেডি নেতা তেজস্বী যাদব। মুখ্যমন্ত্রীর বাসভবন পর্যন্ত মিছিল করার কথা ঘোষণা করেন শিক্ষার্থীরা। সেই কর্মসূচিতেই মঙ্গলবার উত্তপ্ত হয় পটনা।

আনন্দবাজার.কম